July 22, 2026, 6:33 pm

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় এ বছর ১৫০, ১৯৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
শুভব্রত আমান, কুষ্টিয়া
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে নতুন পাটের বাজার এখন পুরোদমে জমে উঠেছে। বেচা ও কেনা দুটোই মোটাদাগে সন্তোষজনক। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় এ বছর ১৫০, ১৯৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
সূত্র জানাচ্ছে, মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দাম পেয়েঝেণ। বর্তমানে বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকায় নেমে এলেও কৃষকদের মতে, উৎপাদন ভালো হওয়ায় এ দামেও তারা লাভের মুখ দেখছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে যশোরে ২৫ হাজার ১২৫ হেক্টর, ঝিনাইদহে ২০ হাজার ২২৭ হেক্টর, মাগুরায় ৩৪ হাজার ৮১৮ হেক্টর, কুষ্টিয়ায় ৪০ হাজার ৩১৫ হেক্টর, চুয়াডাঙ্গায় ৯ হাজার ১৩৫ হেক্টর এবং মেহেরপুরে ২০ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
কৃষক সূত্রে জানা গেছে, এবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির ঘাটতির কারণে অনেক কৃষককে সেচের মাধ্যমে পাটবীজ বপন করতে হয়েছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তবে পরবর্তীতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাটের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে এবং খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় জাগ দেওয়াতেও তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। জুনের মাঝামাঝি থেকে পাট কাটা শুরু হয় এবং মাসের শেষ দিক থেকে বাজারে নতুন পাট ওঠা শুরু করে।
এ অঞ্চলের প্রধান পাটের মোকামগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা, লাঙ্গলবাঁধ, হাটফাজিলপুর, নাগিরাট, হাটগোপালপুর, কোটচাঁদপুর ও বারোবাজার; মাগুরার মহম্মদপুর, শ্রীপুর, নাকোল ও শালিখা; যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, নাভারন ও কেশবপুর; কুষ্টিয়ার কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, দৌলতপুর, পোড়াদহ ও পান্টি; মেহেরপুরের গাংনী, সদর ও মুজিবনগর এবং চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, আলমডাঙ্গা ও সদর বাজার। বর্তমানে এসব বাজারে প্রতিদিনই নতুন পাটের লেনদেন বাড়ছে।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার সারুটিয়া গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান লম্বু জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ মণ ফলন পেয়েছেন। শৈলকুপা হাটে তিনি প্রতি মণ ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে পাট বিক্রি করেছেন। একই উপজেলার বিজুলিয়া গ্রামের কৃষক বাচ্চু মোল্লা বলেন, আট বিঘা জমিতে পাট চাষ করে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১১ মণ ফলন পাচ্ছেন এবং বর্তমানে প্রতি মণ ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
মেহেরপুরের তেঘরিয়া গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, ফলন ভালো হলেও এখনও পুরোপুরি বেচাকেনা শুরু হয়নি। বাজার আরও সক্রিয় হলে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
শৈলকুপা মোকামের পাট ব্যবসায়ী নিরঞ্জন শিকদার জানান, বাজারে পাটের আমদানি দ্রুত বাড়ছে।
শৈলকুপা মোকামের পাট ব্যবসায়ী নিরঞ্জন শিকদার জানান, নতুন পাটের আমদানি প্রতিদিনই বাড়ছে। স্থানীয় হাট ও মোকাম থেকে পাট সংগ্রহ করে তারা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট-বড় পাটকল এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করছেন।
তার ভাষ্য, গড়াই নদী তীরবর্তী এলাকার মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এ অঞ্চলের পাটের আঁশ লম্বা, মসৃণ ও উজ্জ্বল সোনালি রঙের হয়। ব্যবসায়ীদের কাছে এটি পাটের জেলা নামে পরিচিত। উন্নতমানের আঁশ, কম ত্রুটি এবং উচ্চ গ্রেডের কারণে দেশীয় পাটকলের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ক্রেতাদের কাছেও এ পাটের চাহিদা বেশি। ফলে সাধারণ পাটের তুলনায় এ ধরনের পাটের বাজারদরও তুলনামূলক বেশি থাকে।
তিনি বলেন, “যে কৃষক ভালোভাবে পরিচর্যা করে মানসম্মত পাট উৎপাদন করতে পারেন, বাজারে তিনি অন্যদের তুলনায় বেশি দাম পান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঝিনাইদহের উপপরিচালক মো. কমরুজ্জামান বলেন, “এ বছর পাটের আবাদ ও ফলন দুটোই ভালো হয়েছে। বাজারে দামও সন্তোষজনক রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান বাজারদরে কৃষকরা উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভ করতে পারছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, চলতি মৌসুমে পাট উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে সমন্বিত নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। কৃষকদের উন্নত ও মানসম্মত পাটবীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করা, সময়মতো বপন, সার ও সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, আগাছা ও রোগবালাই দমন এবং নিয়মিত মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে কারিগরি পরামর্শ প্রদান করা হয়। এছাড়া উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে সমস্যা সমাধানে কাজ করেছেন।
তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে প্রয়োজনীয় এলাকায় সেচের মাধ্যমে বীজ বপনের পরামর্শ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ সংগ্রহের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কেও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। এসব উদ্যোগ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফলন ভালো হয়েছে।