July 22, 2026, 7:28 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গাজী মো. নজরুল ইসলামের নাম দীর্ঘদিন ধরেই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে আলোচিত। কারণ তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পরবর্তীকালে এমন একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেন, যে দলটির ভূমিকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও সমালোচনার বিষয়। সেই রাজনৈতিক যাত্রারই নতুন অধ্যায় রচিত হলো, যখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিল।
বুধবার জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে দলের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দলীয় সদস্যপদ (রুকন), কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যপদসহ সব সাংগঠনিক পদ থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে পরিচালিত সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে “নৈতিক স্খলনের” অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বহিষ্কারের পেছনে রয়েছে গত কয়েক দিনের আলোচিত একটি ঘটনা। গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলামের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক ১৮ বছর বয়সী তরুণী নিজেকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে পরিচয় দেন এবং জানান, তাঁদের বিয়ে হয়েছে গত ১৭ জুন। তরুণীর বাবা ও গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রীও বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে সংশ্লিষ্ট কাজী জানান, বিয়ের নিবন্ধন হয়েছে ১৯ জুলাই, যা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধনের বিধান রয়েছে; সেই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি তাঁর অতীত। তিনি নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত করেছেন এবং স্বাধীনতার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতৃত্ব পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং দলটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার অভিযোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। সেই প্রেক্ষাপটে একজন মুক্তিযোদ্ধার জামায়াতে যোগদান বরাবরই রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পরবর্তীকালে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য হন এবং দলীয় মনোনয়নে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে তিনি শুধু দলের একজন সাধারণ সদস্য নন, বরং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে দল তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল, সেই দলই নৈতিকতার প্রশ্নে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিল। ঘটনাটি কেবল একজন সংসদ সদস্যের বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি-নৈতিকতা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের জটিল সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবন তাই একাধিক বৈপরীত্যের সাক্ষী—মুক্তিযোদ্ধা থেকে জামায়াতের নেতা, তিনবারের সংসদ সদস্য থেকে দলচ্যুত রাজনীতিক। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।