August 13, 2026, 3:05 pm

ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু ২০২২ সালে, চুক্তি হয় ২০২৪-এ; ২০০ কোচের প্রথম চালানে ১৯টি
দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ভারতের তৈরি নতুন প্রজন্মের ১৯টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেল কোচ। ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালার Rail Coach Factory (RCF)-এ তৈরি এসব কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য নেওয়া ২০০টি আধুনিক কোচের প্রথম চালান। প্রায় এক দশক পর ভারত থেকে আবারও বাংলাদেশে যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ শুরু হচ্ছে।
তবে এই ১৯টি কোচের বাংলাদেশে আসার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ একটি ক্রয়প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহের প্রকল্প গ্রহণ করে ২০২২ সালে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৭০৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (EIB) থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি কোনো ভারতীয় কারখানা থেকে কোচ কেনার বদলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেই দরপত্রে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান RITES Limited প্রায় ১১১.২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৯১৫ কোটি ভারতীয় রুপি মূল্যের প্রস্তাব দিয়ে কাজটি পায়। RITES-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এই চুক্তি অর্জন করে।
এরপর ২০২৪ সালের ২০ মে ঢাকার রেল ভবনে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও RITES-এর মধ্যে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশি হিসাবে চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ২০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটির অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকার ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক—দুই পক্ষই যুক্ত রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী শুধু কোচ সরবরাহ নয়, নকশা-সংক্রান্ত কারিগরি সহায়তা, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্বও RITES-এর। সরবরাহ ও কমিশনিংয়ের জন্য নির্ধারিত সময় ৩৬ মাস এবং এরপর ২৪ মাসের ওয়ারেন্টি রাখার কথা রয়েছে।
প্রকল্প অনুমোদনের পরও দ্রুত ক্রয়চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালের মার্চে প্রকল্পটি গ্রহণের পর চুক্তি স্বাক্ষর করতে দুই বছরের বেশি সময় লাগে। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক জাইদুল ইসলাম এ বিলম্বের জন্য প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, পরামর্শক নিয়োগ এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়গুলোকে দায়ী করেছিলেন।
চুক্তির সময় বলা হয়েছিল, কার্যকর তারিখের পর ২০ মাসের মধ্যে কোচ সরবরাহ শুরু হবে এবং ৩৬ মাসের মধ্যে পুরো চালান সরবরাহ ও কমিশনিং শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই চুক্তির প্রথম চালান হিসেবে এখন ১৯টি কোচ তৈরি করেছে RCF কাপুরথালা। প্রথম রেকে রয়েছে তিনটি এসি স্লিপার, তিনটি এসি চেয়ার কার, ১১টি নন-এসি চেয়ার কার এবং দুটি পাওয়ার কার।
আধুনিক LHB প্রযুক্তির এসব কোচে যাত্রী নিরাপত্তা ও আরামের জন্য বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। রয়েছে উন্নত ক্র্যাশ-সেফটি নকশা, শক্তিশালী ছাদ কাঠামো, CCTV, বিশেষ আসনব্যবস্থা, শিশু পরিচর্যা কক্ষ ও নামাজের কক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী কোচগুলো ৪১৫ ভোল্ট বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
কাপুরথালা থেকে রেলপথে কোচগুলো ভারতের রানাঘাট ও গেদে হয়ে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। এরপর বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টে এগুলো হস্তান্তরের কথা রয়েছে। অর্থাৎ এবারও দুই দেশের বিদ্যমান রেল যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহার করেই নতুন কোচের প্রথম চালান দেশে ঢুকছে।
এর আগে ২০১৫-১৬ সময়কালে ভারত বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১২০টি যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করেছিল। প্রায় এক দশকের বিরতির পর ২০২৬ সালে আবার ভারতীয় কোচ বাংলাদেশে আসছে।
কোচ সংকট কাটানোর লক্ষ্য/
বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে দীর্ঘদিন ধরেই পুরোনো কোচের আধিক্য রয়েছে। ২০০টি নতুন কোচ কেনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো কোচ প্রতিস্থাপন, যাত্রীসেবা বাড়ানো এবং বিশেষ করে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নতুন রেল যোগাযোগকে আরও কার্যকর করা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৬২১টি ব্রডগেজ কোচের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে রেলওয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
ফলে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে আসা ১৯টি কোচ সংখ্যায় ছোট হলেও এটি ২০০ কোচের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রথম ধাপ। চুক্তি অনুযায়ী বাকি কোচগুলো পর্যায়ক্রমে দেশে এলে পুরোনো কোচের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে নতুন ট্রেন চালু বা বিদ্যমান ট্রেনে কোচ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।