August 14, 2026, 3:35 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নকল সিগারেট তৈরির একটি কারখানায় অভিযানের পর জব্দ করা মালামালের পরিমাণ ও মূল্য নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। অভিযান শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেটসহ বিপুল সরঞ্জাম মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল জব্দের কথা জানানো হলেও, একই রাতে দায়ের করা মামলার এজাহারে জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার শলাকা সিগারেট ও ২৫ বস্তা তামাক। এসবের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা।
অভিযানের হিসাব ও মামলার জব্দ তালিকার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার এই পার্থক্যের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযানের সময় যে বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দের কথা বলা হয়েছিল, তার পুরোটা কোথায় গেল এবং মামলার নথিতে তার প্রতিফলন নেই কেন?
গত বুধবার (১২ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের গড়বাড়িয়া গ্রামের হাবিব মাস্টারের গরুর খামারের ভেতরের একটি গোডাউনে অভিযান চালানো হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে অভিযানে পুলিশ ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছিলেন, গোডাউন থেকে ডার্বি, নেভি ও রয়েল ব্র্যান্ডের প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেট এবং সিগারেট তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এসব মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে তখন জানানো হয়।
কিন্তু ওই রাতেই বিএটির কুষ্টিয়ার লিগ্যাল অফিসার কাজী মর্তুজা রেজা বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০ থেকে ১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এজাহারের জব্দ তালিকায় রয়েছে মাত্র ২৫ হাজার শলাকা সিগারেট ও ২৫ বস্তা সিগারেট তৈরির তামাক। এসবের মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা।
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ বলেছেন, বিএটির প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযানের পর প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল জব্দের কথা জানানো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, এত বড় অঙ্কের মালামাল কীভাবে মামলার এজাহারে মাত্র ৩ লাখ টাকায় নেমে এলো, তা মামলার বাদীই বলতে পারবেন।
তবে মামলার বাদী কাজী মর্তুজা রেজার বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, গোডাউন থেকে যে পরিমাণ মালামাল জব্দ করা হয়েছে, সেটিই এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। আর দৌলতপুর থানার ওসি খালেদুর রহমান জানিয়েছেন, বাদীর দেওয়া তালিকার ভিত্তিতেই মামলা নেওয়া হয়েছে।
এতে জব্দ তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা, মামলার বাদী ও পুলিশের বক্তব্যে যখন পরিমাণের এত বড় পার্থক্য, তখন অভিযানের সময় প্রস্তুত করা জব্দ তালিকা, ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও, মালামাল পরিবহনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারখানায় থাকা নকল সিগারেট তৈরির একটি মেশিনের দামই প্রায় ২ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন থানার ওসি। মেশিনটি তালাবদ্ধ করে রাখা হলেও সেটি মামলার জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে মেশিনটি কার হেফাজতে রয়েছে—এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এই পরিস্থিতিতে জব্দের গরমিলের দায় কোনো এক পক্ষের ওপর চাপানোর আগে কয়েকটি বিষয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, অভিযানের সময় ঠিক কত পরিমাণ সিগারেট, তামাক ও সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, সেগুলোর মধ্যে কোনগুলো প্রকৃত অর্থে জব্দ করা হয়েছিল এবং কোনগুলো শুধু ঘটনাস্থলে পাওয়া গিয়েছিল। তৃতীয়ত, অভিযানের পর মালামাল কোথায় রাখা বা হস্তান্তর করা হয়েছে। চতুর্থত, মামলার জব্দ তালিকা তৈরির সময় প্রায় ২০ লাখ শলাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার শলাকা কীভাবে উল্লেখ করা হলো।
এদিকে ওই কারখানার অতীত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গত ৯ মে র্যাব-১২ ও কাস্টমস বিভাগের যৌথ অভিযানে একই স্থানে পাঁচটি নকল সিগারেট তৈরির মেশিন ও প্রায় এক লাখ শলাকা সিগারেট জব্দ করা হয়েছিল। পরে কারখানাটি সিলগালা করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি আবার চালু হয়।
গোডাউনের মালিক হাবিব মাস্টার দাবি করেছেন, তিনি মাসিক ৪০ হাজার টাকা ভাড়ায় জয়রামপুর এলাকার শাকিল ও বৈদ্যনাথতলার লিওন হোসেনের কাছে গোডাউনটি ভাড়া দিয়েছিলেন। সেখানে নকল সিগারেট তৈরির কার্যক্রম চলছিল—এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না বলেও দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্যও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনায় আপাতত সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হলো অভিযানের পর জব্দের হিসাব ও মামলার নথির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি মেশিনের হেফাজত এবং আগের অভিযানে সিলগালা করা কারখানা পুনরায় চালু হওয়ার প্রশ্ন।
তাই নিরপেক্ষ তদন্তে মূলত তিনটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি—অভিযানের সময় প্রকৃতপক্ষে কী জব্দ হয়েছিল, সেই মালামালের বর্তমান অবস্থান কোথায় এবং মামলার এজাহারে কেন তার বড় একটি অংশের উল্লেখ নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, গরমিলটি নিছক নথিগত ভুল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অনিয়ম রয়েছে।