September 6, 2026, 3:28 pm


কুষ্টিয়ার গরম দুপুরে শহরের কোনো ব্যস্ত মোড় কিংবা শিলাইদহের কুঠিবাড়ির আশপাশে লালসালু মোড়ানো একটি হাঁড়ি চোখে পড়লে সেটিকে নিছক ঠান্ডা মিষ্টির হাঁড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু সেই হাঁড়ির ভেতরের কুলফি মালাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ছোট অর্থনীতির গল্প। দুধ বিক্রেতা থেকে কুলফি প্রস্তুতকারক, বরফ ব্যবসায়ী থেকে ফেরিওয়ালা—একটি কুলফির পেছনে তৈরি হয়েছে একাধিক মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া ও শিলাইদহ এলাকার কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কুলফি মালাই তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। কারও কাছে এটি পারিবারিক পেশা, কারও কাছে মৌসুমি ব্যবসা, আবার কারও কাছে বছরের গরম কয়েক মাসের প্রধান আয়ের উৎস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ব্যবসা এখন কুষ্টিয়ার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির পাশাপাশি একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিণত হয়েছে।
কুলফির অর্থনীতির প্রথম ধাপ দুধ। স্থানীয় খামারি ও গৃহস্থের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহের পর শুরু হয় দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব। সাধারণভাবে দুধ কয়েক ঘণ্টা ধরে চুলায় জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। এর সঙ্গে মেশানো হয় চিনি, এলাচ, বাদাম, কিশমিশসহ বিভিন্ন উপকরণ। পরে বিশেষ পদ্ধতিতে বরফ ও লবণের সাহায্যে তা জমিয়ে তৈরি করা হয় কুলফি মালাই।
অর্থাৎ একজন কুলফি বিক্রেতা বাজার থেকে তৈরি পণ্য কিনে এনে বিক্রি করছেন—বিষয়টি এত সরল নয়। একটি কুলফির পেছনে রয়েছে কাঁচামাল সংগ্রহ, জ্বালানি, শ্রম, সময়, সংরক্ষণ এবং পরিবহনের খরচ। কুলফি তৈরির প্রতিটি ধাপেই অর্থের লেনদেন হচ্ছে। ফলে রাস্তার পাশে কয়েক টাকার একটি কুলফি বিক্রির মধ্যেও স্থানীয় অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র চক্র সক্রিয় থাকে।
কয়া গ্রামের আলতাফ হোসেন প্রায় চার দশক ধরে কুলফি বিক্রি করছেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি এই কাজ শিখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই পেশায় থাকার কারণে কুলফি তার কাছে শুধু ব্যবসা নয়, পারিবারিক ঐতিহ্যও। একইভাবে অনেক পরিবারে কুলফি তৈরির কাজটি একা একজনের হাতে থাকে না। পরিবারের নারী সদস্যরা দুধ জ্বাল দেওয়া, উপকরণ প্রস্তুত করা কিংবা কুলফি জমিয়ে রাখার কাজে যুক্ত থাকেন; পুরুষ সদস্যরা অনেক সময় তা নিয়ে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতে বের হন।
এভাবে কুলফি ব্যবসার সঙ্গে পারিবারিক শ্রম সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি একজন ফেরিওয়ালার ব্যবসা মনে হলেও এর উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে একাধিক মানুষের অংশগ্রহণ। ছোট পরিসরের এই পারিবারিক উৎপাদনব্যবস্থাই কুলফিকে একটি ক্ষুদ্র খাদ্যশিল্পের রূপ দিয়েছে।
কুলফি মালাইয়ের এই অর্থনীতি অবশ্য সারা বছর সমান গতিতে চলে না। গরমের কয়েক মাসই এর প্রধান মৌসুম। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা খাবারের চাহিদা বাড়ে, আর তখনই কুলফি বিক্রেতাদের হাঁড়ি ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এই মৌসুমি চাহিদাকে কেন্দ্র করে কয়েক মাসে যে আয় হয়, তা অনেক পরিবারের জন্য বছরের গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক অবলম্বন।
একজন বিক্রেতার দিনের আয় হিসাব করতে গেলেও বিষয়টি শুধু বিক্রির পরিমাণ দিয়ে বোঝা যায় না। কত লিটার দুধ কেনা হয়েছে, তার দাম কত, কত টাকা চিনি ও অন্যান্য উপকরণে ব্যয় হয়েছে, জ্বালানি ও বরফের খরচ কত, উৎপাদনে পরিবারের শ্রমের মূল্য কত এবং বিক্রির জন্য পরিবহন খরচ কত—সব মিলিয়ে প্রকৃত লাভ নির্ধারিত হয়।
এখানেই কুলফি ব্যবসার অর্থনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিক্রির পর যে অর্থ হাতে আসে, তার পুরোটাই ব্যবসায়ীর লাভ নয়। এর একটি অংশ চলে যায় দুধ বিক্রেতার কাছে, একটি অংশ কাঁচামালের বাজারে, আরেকটি অংশ বরফ ও পরিবহন খাতে। বাকি অংশ থেকে পরিবারের শ্রমের মূল্য ও ব্যবসায়ীর মুনাফা নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ একটি ছোট পণ্যের বিক্রিও স্থানীয় বাজারে অর্থের একাধিক স্তরে প্রবাহ তৈরি করে।
কুলফির বাজার আবার কুষ্টিয়া শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। কয়া ও শিলাইদহের তৈরি কুলফির চাহিদা জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়িয়ে অন্য শহরেও পৌঁছেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কুলফির চাহিদার কথা ব্যবসায়ীরা জানান। দূরের বাজারে পাঠাতে হলে প্রয়োজন হয় বিশেষ সংরক্ষণব্যবস্থা। বরফের সাহায্যে কুলফি ঠান্ডা রাখা, দ্রুত পরিবহন এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া—এসবও ব্যবসার অতিরিক্ত ব্যয়ের অংশ।
অন্যদিকে শিলাইদহের কুঠিবাড়ি ও লালনের আখড়াবাড়িকে ঘিরে পর্যটন অর্থনীতিও কুলফির বাজারকে সহায়তা করছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীদের কাছে স্থানীয় খাবারের আকর্ষণ আলাদা। ফলে কুলফি এখানে শুধু তৃষ্ণা বা গরম থেকে স্বস্তি পাওয়ার খাবার নয়; কুষ্টিয়ার স্থানীয় অভিজ্ঞতারও একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
কুলফির এই জনপ্রিয়তার পেছনে এর স্বাদ যেমন কাজ করছে, তেমনি কাজ করছে এর তৈরির পদ্ধতিও। শিল্পোৎপাদিত আইসক্রিমের সঙ্গে হাতে তৈরি কুলফির পার্থক্য রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা এবং সীমিত পরিসরে হাতে তৈরি করার কারণে এর স্বাদ ও ঘ্রাণে একটি স্থানীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যই পণ্যটিকে অন্য বাজারে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এই ক্ষুদ্র অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দুধ, চিনি, বাদাম, এলাচ, বরফ ও জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। কুলফির দাম খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়, কারণ ক্রেতার বড় অংশ সাধারণ মানুষ ও পর্যটক। ফলে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনেক সময় ব্যবসায়ীর মুনাফায় গিয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় সমস্যা সংরক্ষণ। কুলফি এমন একটি পণ্য, যার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ঠান্ডা পরিবেশ প্রয়োজন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো আধুনিক কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার নেই। ফলে দূরের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে গেলে পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ বা বরফের সংকটও ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তারপরও কুষ্টিয়ার কুলফি মালাইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদনব্যবস্থা, মানসম্মত প্যাকেজিং, স্থানীয় ব্র্যান্ডিং এবং উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা চালু করা গেলে এই পণ্য স্থানীয় বাজারের বাইরে আরও বড় বাজারে যেতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং খাদ্যপণ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো দেওয়া গেলে ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসা একটি টেকসই ক্ষুদ্র শিল্পে রূপ নিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কুষ্টিয়ার পর্যটনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিলাইদহ, লালন আখড়াবাড়ি ও জেলার অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় খাদ্যপণ্যের একটি স্বতন্ত্র বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। কুলফি মালাইকে সেই স্থানীয় ব্র্যান্ডের একটি অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
একটি কুলফির দাম হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই কুলফি তৈরির জন্য যে দুধ লাগে, সেই দুধ আসে একজন খামারির কাছ থেকে; দুধ জ্বাল দিতে লাগে জ্বালানি; স্বাদ দিতে লাগে চিনি, এলাচ, বাদাম ও কিশমিশ; জমাতে লাগে বরফ; বাজারে নিতে লাগে পরিবহন; আর সবশেষে তা বিক্রি করে একটি পরিবার আয় করে। অর্থাৎ কুলফির হাঁড়ি আসলে একটি ক্ষুদ্র সরবরাহচক্রের কেন্দ্র।
এই কারণেই কুষ্টিয়ার কুলফি মালাইয়ের গল্প শুধু পুরোনো স্বাদের গল্প নয়। এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তা, পারিবারিক শ্রম, মৌসুমি বাজার, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং পর্যটন অর্থনীতির একটি মিলিত চিত্র। বড় শিল্পের হিসাবের বাইরে থাকা এমন ছোট ছোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাস্তার পাশে একটি কুলফির হাঁড়ি তাই যতটা ছোট, তার পেছনের অর্থনীতি ততটা ছোট নয়। সেখানে জমে থাকে কয়েক প্রজন্মের দক্ষতা, কয়েক মাসের মৌসুমি শ্রম এবং বহু মানুষের জীবিকার হিসাব। কুষ্টিয়ার কুলফি মালাই সেই অর্থে শুধু একটি খাবার নয়—একটি স্থানীয় অর্থনীতির স্বাদও।