September 19, 2026, 1:55 pm

গড়াইয়ে নৌকাবাইচে ফিরেছে নদীকেন্দ্রিক উৎসব
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
গড়াইয়ের বুকে ছুটছে সারি সারি নৌকা। ছন্দ মিলিয়ে দাঁড় টানছেন মাঝিমাল্লারা। নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠছে ‘হেইও রে হেইও’ ধ্বনি। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ দেখছেন প্রতিযোগিতার উত্তেজনা। কোথাও শিশুদের উচ্ছ্বাস, কোথাও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়। নদীর তীর ঘেঁষে বসেছে গ্রামীণ মেলা। সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ঘোড়াইঘাটে গড়াই নদী এখন পরিণত হয়েছে এক বড় জনসমাগমের কেন্দ্রে।
দীর্ঘ চার বছর পর গড়াই নদীতে ফিরে এসেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের আজ শনিবার দ্বিতীয় দিন। গত শুক্রবার উদ্বোধনের পর থেকেই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। আগামীকাল রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের আয়োজন।
কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে শুক্রবার বিকেল ৩টায় ঘোড়াইঘাটে নৌকাবাইচের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী দিনে কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সাতটি দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ২০২২ সালের পর এবারই আবার ঘোড়াইঘাটে নৌকাবাইচের আসর বসায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
নদীতে প্রতিযোগিতা যতটা, নদীর দুই পাড়ে মানুষের অংশগ্রহণও যেন ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। প্রতিযোগিতা শুরু হলে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে নদীতীর। নৌকার গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে করতালি, চিৎকার ও উৎসাহ-উদ্দীপনা।
নদীর সঙ্গে ফিরে এসেছে পুরোনো সংস্কৃতি
একসময় গড়াইসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান বিনোদন ও সামাজিক উৎসব। নদীকেন্দ্রিক জনপদে নৌকাবাইচ শুধু প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল মানুষের মিলন, আনন্দ ও লোকজ সংস্কৃতির প্রকাশ। সময়ের সঙ্গে নদীর নাব্যতা, বিনোদনের ধরন পরিবর্তন এবং নানা সামাজিক বাস্তবতায় সেই আয়োজন অনেকটাই কমে এসেছে।
চার বছর পর ঘোড়াইঘাটে নৌকাবাইচের আয়োজন সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের কথাই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; বরং নদী ও জনজীবনের পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে দৃশ্যমান করার একটি উপলক্ষ।
মেলার কারণে বাড়ছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে ঘোড়াইঘাট এলাকায় বসেছে গ্রামীণ মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। বিভিন্ন ধরনের খাবার, খেলনা, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও স্থানীয় পণ্যের দোকান বসেছে। দর্শনার্থীদের ভিড়ে জমে উঠেছে বেচাকেনা। ফলে নৌকাবাইচের সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মৌসুমি বিক্রেতাদের জন্যও এটি তৈরি করেছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন ছোট ব্যবসাতেও তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত কর্মচাঞ্চল্য। ফলে তিন দিনের এই আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে সাময়িক হলেও দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে।
যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য
আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ইমরান হোসেন ইউনুস বলেন, মাদকসহ নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয় থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখা এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয়েছে। কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নৌকাবাইচের দল এতে অংশ নিচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, আধুনিক বিনোদনের বিস্তারের সময়ে লোকজ সংস্কৃতির এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পৃক্ততাও বাড়ায়।
কাল সমাপনী
তিন দিনের আয়োজনের শেষ দিন আগামীকাল রোববার। সমাপনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আরও বড় সমাগমের প্রত্যাশা করছেন আয়োজকরা। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের জন্য মোটরসাইকেল, ফ্রিজ ও টেলিভিশনসহ রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় পুরস্কার।
চার বছর পর গড়াইয়ের বুকে নৌকাবাইচের এই প্রত্যাবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে—নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়, একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেরও অংশ। ঘোড়াইঘাটে গত দুই দিনের উৎসব সেই পুরোনো সম্পর্ককেই যেন আবার দৃশ্যমান করে তুলেছে। আগামীকাল সমাপনী প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এবারের আয়োজন শেষ হলেও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা—গড়াইয়ের বুকে এই ঐতিহ্য যেন আর দীর্ঘ বিরতিতে হারিয়ে না যায়।