September 14, 2026, 12:12 pm

ড. আমানুর আমান /
খবরটি নিঃসন্দেহে খুব উদ্বেগের। বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ ছিল। হালে এসে মৃত্যুর হার মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। আতঙ্কিত সরকারও। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে মশার বিরুদ্ধে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শুরু হয়েছে তিন মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা অভিযান। কিন্তু এই মুহূর্তে আতঙ্কের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সামনে আনা জরুরি—ডেঙ্গু কি হঠাৎ করে আমাদের ওপর নেমে এসেছে?
উত্তরটি হলো, না।
ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিপদ নয়। বরং বহু বছর ধরে এটি আমাদের নগরজীবন ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ২০১৯ সালে বড় ধরনের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব আমরা দেখেছি। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ আমাদের সামনে সতর্কবার্তার অভাব ছিল না। অভিজ্ঞতার অভাবও ছিল না। তাহলে আজ আবার কেন একই আতঙ্ক?
এখানেই মূল প্রশ্ন—এটি কি অনিবার্য, নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল?
অবশ্যই সবকিছুর জন্য সরকারকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। ডেঙ্গু একটি জটিল রোগ। জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণতা, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মানুষের চলাচল—সবকিছুই এর বিস্তারে ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া এডিস মশার বিস্তারের জন্য সহায়ক হচ্ছে। এবারের পরিস্থিতিতে ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে; দেশের ৬৪ জেলাতেই সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
কিন্তু ‘অনিবার্য’ শব্দটি দিয়ে কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। অথচ আমাদের নগরজীবনে পানি জমে থাকার অসংখ্য স্থান তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন—নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ও বেজমেন্টে, পরিত্যক্ত পাত্রে, ড্রেনে, প্লাস্টিকের বর্জ্যে, বাড়ির ছাদে, ফুলের টবে, এমনকি এমন সব জায়গায় যেখানে আমাদের চোখই পড়ে না।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এসব জায়গা কি আজ তৈরি হয়েছে?
না। বছরের পর বছর ধরেই তৈরি হচ্ছে।
ডেঙ্গু আসার পর আমরা মশা খুঁজি, কিন্তু মশার প্রজননের পরিবেশ তৈরি হওয়ার সময় আমরা কোথায় থাকি? বর্ষা এলে অভিযান শুরু করি, অথচ বর্ষার আগেই যদি সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্ত করে ধ্বংস করা যেত, তাহলে পরিস্থিতি কি এতটা ভয়াবহ হতো?
এখানে আমাদের মশকনিধন ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা চোখে পড়ে। আমরা অনেক সময় মশা মারার অর্থ হিসেবে ‘ফগিং’-কে বুঝি। ধোঁয়া দেখলেই মনে হয় বড় কোনো অভিযান চলছে। কিন্তু ফগিং দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মশা কমানো গেলেও যেখানে লার্ভা জন্ম নিচ্ছে, সেই স্থানে ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার মূলটি থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যেও একই কথা উঠে এসেছে—শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অর্থাৎ আমাদের দরকার ‘মশা মারার’ অভিযান নয়, ‘মশা জন্মাতে না দেওয়ার’ ব্যবস্থা।
আর এখানেই আসে প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন।
একটি শহরে কোথায় পানি জমছে, কোথায় নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে, কোন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব বাড়ছে—এসব তথ্য কি নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে? মশার ঘনত্ব নির্ণয়ের বৈজ্ঞানিক জরিপ কি যথেষ্ট হচ্ছে? কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, তার সঙ্গে মশার ঘনত্বের তথ্য মিলিয়ে কি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে? নাকি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কিছু ওষুধ ছিটানো এবং গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েই আমরা দায়িত্ব শেষ করছি?
যদি দ্বিতীয়টিই সত্য হয়, তবে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য শুধু স্বাস্থ্যসংকট নয়; এটি ব্যবস্থাপনার সংকটও।
এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে এবারের পরিস্থিতি নিয়ে সরকার এখন সক্রিয় হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে একদিনেই ১,৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চারজনের মৃত্যুর খবর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। এরপর সরকার দেশব্যাপী তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা অভিযান শুরু করেছে। প্রতি শনিবার বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্ত ও পরিষ্কার করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সংকটের মুহূর্তের উদ্যোগ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার অংশ?
কারণ ডেঙ্গু সেপ্টেম্বরের রোগ নয়। বর্ষার রোগও শুধু নয়। এটি এখন আমাদের দেশে অনেকটাই বছরজুড়ে থাকা একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ফলে জানুয়ারি থেকে প্রস্তুতি নিয়ে সেপ্টেম্বরের সংকট সামলানোর মতো ব্যবস্থা নয়; বরং সারা বছর মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে রাখাই হওয়া উচিত মূল কৌশল।
আমাদের আরও একটি ভুল ধারণা কাটাতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ নয়। এটি একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, গণপূর্ত, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ খাত এবং সাধারণ নাগরিকের বিষয়। একটি নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকলে শুধু মশা মারার কর্মীকে পাঠিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ভবন মালিককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হলে শুধু নাগরিককে সচেতন করলেই হবে না; অবকাঠামোগত সমস্যারও সমাধান করতে হবে।
তাই প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান—সবাইকে এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান—গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই ‘সবাই’-এর মধ্যে সরকারও আছে, প্রশাসনও আছে, সিটি করপোরেশনও আছে, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানও আছে, নাগরিকও আছে।
দায়িত্ব শুধু জনগণের নয়।
প্রতি বছর যখন ডেঙ্গু বাড়ে, তখন নাগরিকদের বলা হয়—বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন, পানি জমতে দেবেন না। নিঃসন্দেহে নাগরিকের দায়িত্ব আছে। কিন্তু একজন নাগরিক যদি তার বাড়ির সামনে পানি জমতে না দেন, পাশের নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টে যদি হাজার হাজার লিটার পানি জমে থাকে, তাহলে তিনি কতটা নিরাপদ?
এ কারণেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা। ডেঙ্গু শুধু মশার সমস্যা নয়; গুরুতর রোগীর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়ও। রোগীর জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপদের আশঙ্কা থাকে এবং সেই সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এবারের পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, কোথাও কোথাও শয্যার সংকটও দেখা দিয়েছে।
অতএব, প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হবে, সেটিও আগেভাগে বিবেচনায় নিতে হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি আবারও করতে হয়—ডেঙ্গুর এই বিস্তার কি অনিবার্য ছিল?
পুরোপুরি নয়। আবহাওয়া আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, জলবায়ু পরিবর্তনও একদিনে থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু কোথায় পানি জমবে, শহরের বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা হবে, নির্মাণাধীন ভবন কতটা নিয়ম মেনে চলবে, মশার ঘনত্ব কোথায় বাড়ছে—এসব অনেকটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।
তাই ডেঙ্গুর প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের ব্যবস্থার কোথাও একটি ব্যর্থতারও ইঙ্গিত।
আজ আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আতঙ্ক দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সাময়িক অভিযান দিয়েও নয়। দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর, বছরব্যাপী এবং জবাবদিহিমূলক মশকনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
আমরা যদি প্রতি বছর ডেঙ্গু বাড়ার পর যুদ্ধ ঘোষণা করি, তাহলে এই যুদ্ধ কোনোদিন শেষ হবে না। বরং আমাদের এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ডেঙ্গু বাড়ার আগেই আমরা প্রস্তুত থাকি।
কারণ প্রশ্নটি কেবল এই নয়—এবার কতজন আক্রান্ত হলেন বা কতজন মারা গেলেন।
বড় প্রশ্ন হলো—আগের বছরগুলো থেকে আমরা কী শিখলাম?
আর সেই শেখা যদি কাজে না লাগাই, তাহলে আগামী বছর একই প্রশ্ন নিয়ে আবারও আমাদের কলম ধরতে হবে, আবারও সরকারকে অভিযান ঘোষণা করতে হবে, আবারও মানুষকে আতঙ্কিত হতে হবে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সত্যিকারের বিজয় সেদিনই আসবে, যেদিন মৃত্যুর সংখ্যা কমার পর আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলব না; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে মৃত্যুর সেই সংখ্যা বাড়ার সুযোগই থাকবে না।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস