September 14, 2026, 12:11 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সদস্য দেশগুলোর নেতারা ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও ভূরাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য সংঘাত নিয়েও সম্মেলনে আলোচনা হয়।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা অংশ নেন। সম্প্রসারিত ব্রিকসের এই সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, বাণিজ্যিক শুল্ক এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে।
সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই নেতা ভারত-চীন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত না করার বিষয়ে একমত হন।
বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। মোদি বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে বিদ্যমান সীমান্ত-সংক্রান্ত চুক্তি ও সমঝোতাগুলো মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়। দুই পক্ষ সীমান্ত সমস্যার একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
ভারত-চীন সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকও বৈঠকে আলোচনায় আসে। দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং দুই দেশের বাজারে আরও পূর্বানুমেয় ও কার্যকর প্রবেশাধিকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও নাগরিকদের চলাচল বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে সম্মেলনে গৃহীত নয়াদিল্লি ঘোষণায় ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, সংহতি, অন্তর্ভুক্তি ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকার করে। অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্রিকস নেতারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানো এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একতরফা পদক্ষেপ, বাণিজ্য বাধা এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জলবায়ু সহযোগিতার মতো বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনাও বিশেষ গুরুত্ব পায়। ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ থাকায় এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা ছিল কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের আগে ও চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমানো এবং সংযমের আহ্বান জানিয়ে সদস্যদের মধ্যে যৌথ অবস্থানও উঠে আসে।
সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল চীনের পরবর্তী সভাপতিত্ব গ্রহণ। ২০২৭ সালে ব্রিকসের পরবর্তী কার্যক্রমে চীন নেতৃত্ব দেবে। ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে সম্প্রসারিত ব্রিকসকে শুধু রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় আরও কার্যকর সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হলো—ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো ধরে রাখতে চাইছে। আর ভারত-চীন বৈঠক থেকে পাওয়া বার্তাটি সরাসরি কোনো বড় সীমান্ত সমাধান নয়; বরং মতপার্থক্যকে সংঘাতে রূপ না দিয়ে সীমান্তে শান্তি বজায় রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার একটি কূটনৈতিক অঙ্গীকার।