February 27, 2026, 12:06 pm

শুভব্রত আমান, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে
ঝিনাইদহ জেলা-এ গত তিন বছরে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সামাজিক ও আর্থিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা, পারস্পরিক আস্থা হ্রাস, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব—এই প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্থানীয় আদালত ও জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় মোট ৮ হাজার ২৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয় এবং একই বছরে ৩ হাজার ৯৮৪টি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২১টি বিয়ে এবং ১১টি বিচ্ছেদ হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি। ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩৪৬ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ২৩৪ জন নারী তালাক দিয়েছেন।
উপজেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ ঘটেছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা-এ—১ হাজার ১৬২টি। এছাড়া শৈলকুপা উপজেলা-এ ৭৯৪টি, মহেশপুর উপজেলা-এ ৯৭৮টি, কালীগঞ্জ উপজেলা, ঝিনাইদহ-এ ৪৭৭টি, হরিণাকুণ্ডু উপজেলা-এ ৩৬২টি এবং কোটচাঁদপুর উপজেলা-এ ২১১টি তালাক নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২৪ সালেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ওই বছরে ৭ হাজার ৩২৭টি বিয়ে এবং ৩ হাজার ১৭৭টি বিচ্ছেদ হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০টি বিয়ে ও ৮টি বিচ্ছেদ ঘটেছে।
২০২৪ সালে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে ১ হাজার ১৬৬টি, স্বামীদের পক্ষ থেকে ২৫৯টি এবং উভয়ের সম্মতিতে ১ হাজার ৭৫২টি তালাকের ঘটনা ঘটে। একতরফা বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি ছিল—যা পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
২০২৩ সালে জেলায় ৯ হাজার ৪৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয় এবং ৩ হাজার ৯৮৪টি তালাক কার্যকর হয়। ওই বছর গড়ে প্রতিদিন ২৪টি বিয়ে এবং ১০টি বিচ্ছেদ হয়েছে। ওই বছরে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৭৪৬টি এবং স্বামীদের পক্ষ থেকে ৩৮৪টি তালাক আবেদন জমা পড়ে।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জেলায় প্রায় ১৮ হাজার তালাকের ঘটনা ঘটেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
তালাক নোটিশ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ দম্পতি বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে “স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব” উল্লেখ করেছেন।
নারীদের আবেদনে ভরণ-পোষণ না পাওয়া, সন্দেহ, জোরপূর্বক বিয়ে, কাবিন সংক্রান্ত সমস্যা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুক, মানসিক নিপীড়ন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, আর্থিক সংকট এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পুরুষদের নোটিশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, আয় কমে যাওয়া, বেপরোয়া জীবনযাপন, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়া, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং ধর্মীয় অনুশাসন না মানার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঝিনাইদহ পৌরসভা-এর কলেজ শিক্ষক সাকিলা খাতুন দোলা জানান, আগে মাসে ৮ থেকে ১০টি তালাক নিবন্ধিত হতো। বর্তমানে অনেক সময় দিনে ১০ থেকে ১২টি তালাক নিবন্ধন হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক দম্পতি বিয়ের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদের পথে যাচ্ছে। ছোটখাটো সমস্যাতেও মানুষ অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। সমাজে ধৈর্য ও সহনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলা ও দায়রা জজ আদালত-এর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শেখ সেলিম বলেন, তরুণ দম্পতিদের মধ্যে ধৈর্য কমে যাচ্ছে। পারিবারিক সমস্যা সমাধানের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ায় ছোটখাটো বিরোধও এখন বিচ্ছেদের দিকে যাচ্ছে।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মী ড. ওয়ালিদ হাসান পিকুল বলেন, বাড়তে থাকা তালাকের হার শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন। তিনি পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সহায়তা কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি কাউন্সেলিং সেবা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা-এর সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল হাই বলেন, সন্তানরা বিচ্ছেদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বিয়ের আগে চিকিৎসা পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ঝিনাইদহ-এর অতিরিক্ত উপপরিচালক মুন্সী ফিরোজা জানান, সরকার বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, কারণ এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক সংলাপ, প্রাক-বিবাহ কাউন্সেলিং এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।