June 27, 2026, 1:09 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলািইন/
দেশের প্রায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এখন একটি অপরিহার্য দলিল। ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট করা, জমি নিবন্ধন, মোবাইল সিম নিবন্ধন, সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা গ্রহণ থেকে শুরু করে ভোটাধিকার প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই এনআইডি এখন পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। অথচ একবার এনআইডি করার পর অনেকের তথ্য বছরের পর বছর আর হালনাগাদ হয় না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে এবার জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়ন বাধ্যতামূলক করার চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি এনআইডি ইস্যুর ১৫ বছর পূর্ণ হলে সেটি বাধ্যতামূলকভাবে নবায়ন করতে হতে পারে। বর্তমানে আইনে নবায়নের সুযোগ থাকলেও এটি বাধ্যতামূলক নয়। তবে নাগরিকদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য সময়োপযোগী ও নির্ভুল রাখতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন প্রয়োজন হচ্ছে বাধ্যতামূলক নবায়ন?
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৫ বছরে একজন মানুষের শারীরিক গঠনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসা খুবই স্বাভাবিক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখমণ্ডলের অবয়ব বদলে যায়, চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে, এমনকি আঙুলের ছাপেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ফলে বহু বছর আগের ছবি বা বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া চিকিৎসাজনিত কারণে কেউ লিঙ্গ পরিবর্তন করলে বা অন্য কোনো শারীরিক পরিবর্তন ঘটলে পুরোনো এনআইডির তথ্য আর বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিল নাও থাকতে পারে। এতে পরিচয় শনাক্তকরণে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ইসির কর্মকর্তাদের মতে, নির্দিষ্ট সময় পরপর ছবি, বায়োমেট্রিক তথ্য ও ব্যক্তিগত তথ্য হালনাগাদ করা গেলে জাতীয় পরিচয়পত্র আরও নির্ভরযোগ্য হবে। একই সঙ্গে জালিয়াতি, পরিচয় চুরি (Identity Fraud) এবং ভুয়া পরিচয়ে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ঝুঁকিও কমবে।
আইনে কী আছে?
জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন, ২০১০ অনুযায়ী, একটি এনআইডির মেয়াদ ইস্যুর তারিখ থেকে ১৫ বছর। আইনের ২ ধারায় বলা হয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বা পরে নির্ধারিত পদ্ধতি ও ফি দিয়ে কমিশনের কাছে নবায়নের আবেদন করা যাবে। তবে বর্তমানে এটি ঐচ্ছিক; অর্থাৎ নবায়ন না করলেও এনআইডি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।
জাতীয় পরিচয়পত্র বিধিমালা অনুযায়ী নাগরিকরা সরাসরি কিংবা অনলাইনে এনআইডি নবায়নের আবেদন করতে পারেন। সাধারণ আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে এবং জরুরি আবেদন ৭ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। সাধারণ আবেদনের জন্য ১০০ টাকা এবং জরুরি আবেদনের জন্য ১৫০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবায়ন ও প্রতিস্থাপন এক বিষয় নয়
অনেকেই এনআইডি হারিয়ে গেলে, নষ্ট হয়ে গেলে বা পুরোনো কার্ডের পরিবর্তে নতুন কার্ড নিলে সেটিকে নবায়ন মনে করেন। বাস্তবে দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা।
নবায়ন (Renewal) হলো মেয়াদ শেষে পরিচয়পত্রের তথ্য ও বৈধতা হালনাগাদ করা। আর প্রতিস্থাপন (Replacement) হলো হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত কার্ডের পরিবর্তে নতুন কার্ড নেওয়া।
বর্তমানে প্রতিস্থাপনের জন্য প্রথমবার সাধারণ আবেদনে ২০০ টাকা ও জরুরি আবেদনে ৩০০ টাকা ফি দিতে হয়। দ্বিতীয়বার যথাক্রমে ৩০০ ও ৫০০ টাকা এবং এরপর প্রতিবার সাধারণ আবেদনে ৫০০ টাকা ও জরুরি আবেদনে ১ হাজার টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।
নাগরিকদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে?
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর প্রত্যেক নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে এনআইডি নবায়ন করতে হবে। এতে নতুন ছবি, হালনাগাদ বায়োমেট্রিক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজে সংযুক্ত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচয় যাচাই আরও দ্রুত ও নির্ভুল হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, স্মার্ট পরিচয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিরাপদ নাগরিক ডাটাবেজ তৈরিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কী বলছে নির্বাচন কমিশন?
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজন হলে যেকোনো নাগরিক আবেদন করে এনআইডি নবায়ন বা নতুন কার্ড নিতে পারেন।
অন্যদিকে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো পর্যালোচনাধীন। আইনি, কারিগরি ও প্রশাসনিক সব দিক বিবেচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, বাধ্যতামূলক এনআইডি নবায়নের সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, যা নাগরিক পরিচয় ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও হালনাগাদকেন্দ্রিক করে তুলবে।