July 20, 2026, 1:18 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর পুনর্ভর্তি ফি শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচার লঙ্ঘন করছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া/ গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সম্পন্নের সময় বাড়ল, শেষ সুযোগ ২১ জুলাই লোকসানি রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারদর এক সপ্তাহে বেড়েছে ২৭% খোকসায় মাদক ব্যবসার টাকা ভাগ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জোড়া খুন, আহত ১ সাজিদ আব্দুল্লাহর ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে ইবিতে ছাত্রদলের দোয়া ও মিলাদ শেষ সাত মিনিটে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা মেধা, অনুভূতি ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে দেশ-জাতি গঠনে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে’ — ইবি উপাচার্য মিনিকেট মিথ/প্রতারণার পালিশে হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্টি (দ্বিতীয় পর্ব) মিনিকেট মিথ/প্রতারণার পালিশে হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্টি (প্রথম পর্ব) কুষ্টিয়ায় সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ, অপসারণের নির্দেশ এলজিইডির

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর পুনর্ভর্তি ফি শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচার লঙ্ঘন করছে

ড. আমানুর আমান
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী? সড়ক নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নাকি অবকাঠামো উন্নয়ন? এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় সে তার শিশুদের জন্য কতটা ন্যায়সঙ্গত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে তার ওপর। কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী দিনের নাগরিক, বিচারক, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনায়ক তৈরি হয়। সেই শ্রেণিকক্ষেই যদি বৈষম্য, আর্থিক অনিয়ম এবং আইনের অবমাননার সংস্কৃতি প্রবেশ করে, তাহলে তার অভিঘাত বহু বছর ধরে রাষ্ট্রকে বহন করতে হয়।
একটি রাষ্ট্রকে বিচার করা যায় সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। শিশু ও শিক্ষার্থীরা সেই দুর্বলতম নাগরিকদের অন্যতম। কারণ তারা নিজের অধিকারের জন্য আদালতে দাঁড়াতে পারে না, নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি জানাতে পারে না, কিংবা প্রশাসনের দরজায় গিয়ে প্রতিকার চাইতে পারে না। তাদের হয়ে কথা বলতে হয় রাষ্ট্রকে, সমাজকে এবং আইনের শাসনকে। তাই শিক্ষাখাতে কোনো বৈষম্য বা অন্যায় কেবল একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

বাংলাদেশে শিক্ষা একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে তাকে বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়। কোথাও এর নাম পুনর্ভর্তি ফি, কোথাও উন্নয়ন ফি, কোথাও সেশন চার্জ, আবার কোথাও বার্ষিক প্রশাসনিক ব্যয়। নাম ভিন্ন হলেও আর্থিক চাপ একই থেকে যায়।

এখানেই প্রশ্নটি কেবল অর্থের নয়; এটি ন্যায়বিচারের।

২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পুনর্ভর্তির নামে ভর্তি ফি আদায়কে আইনসংগত নয় বলে রায় দিয়েছেন। এই রায়ের তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। আদালত মূলত একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন—একজন শিক্ষার্থী একই প্রতিষ্ঠানে তার শিক্ষা অব্যাহত রাখছে; তাই তাকে নতুন শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচনা করে পুনরায় ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না।

কিন্তু যদি একই অর্থ অন্য নামে আদায় করা হয়, তাহলে আইনের ভাষা হয়তো পাল্টায় না, কিন্তু আইনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। আদালতের রায়ের আত্মাকে পাশ কাটিয়ে শব্দের পরিবর্তন করে একই আর্থিক বোঝা বহাল রাখা আইনের শাসনের জন্যও একটি অস্বস্তিকর সংকেত।

এখানে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার কে? অভিভাবক নন, শিক্ষার্থী।

কারণ শিক্ষার্থীর শিক্ষা তখন তার মেধা, পরিশ্রম কিংবা স্বপ্নের ওপর নয়; পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কয়েক হাজার টাকার অতিরিক্ত ব্যয় কখনো কখনো সন্তানের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সংবিধানে ঘোষিত সমান সুযোগের ধারণা বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি আদালতের রায়কে কার্যকরভাবে অনুসরণ না করে, তাহলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? বিদ্যালয় শুধু গণিত, বিজ্ঞান বা ভাষা শেখায় না; বিদ্যালয় নাগরিকত্ব শেখায়। সেখানে যদি তারা দেখে যে আইনের ভাষা মানা হয়, কিন্তু উদ্দেশ্য এড়িয়ে যাওয়া যায়, তাহলে সেটিই হয়ে ওঠে তাদের প্রথম নাগরিক শিক্ষা। এটি কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, কিন্তু সেই স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত রয়েছে জবাবদিহি। যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান কিংবা নেপালের অভিজ্ঞতা দেখায়—ফি নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, অভিভাবকের অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক তদারকি ছাড়া শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় না। শিক্ষা একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান; এটি কেবল একটি সেবাখাত নয়।

বাংলাদেশ এখন শিক্ষা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি নীতিগত পরীক্ষাও বটে। শিক্ষা খাতে সংস্কার শুধু নতুন ভবন নির্মাণ, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ বা ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত সংস্কার শুরু হবে তখনই, যখন একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিত হবে যে তার শিক্ষা কোনো অযৌক্তিক আর্থিক দাবির কারণে ব্যাহত হবে না।

এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, হাইকোর্টের রায়ের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন নির্দেশিকা জারি করতে হবে, যাতে পুনর্ভর্তি নিষিদ্ধ করে অন্য নামে একই অর্থ আদায়ের সুযোগও বন্ধ হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ ফি কাঠামো জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। গোপন বা অস্পষ্ট ফি কাঠামো দুর্নীতির অন্যতম উৎস।

তৃতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক হবে।

চতুর্থত, নিয়ম লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সতর্কীকরণ নয়, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার লঙ্ঘনের বাস্তব পরিণতি থাকে।

আজকের বাংলাদেশে শিক্ষাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হওয়া উচিত নয়—কোন নামে ফি নেওয়া হবে। বিতর্ক হওয়া উচিত—কোনো শিক্ষার্থী কি অর্থের অভাবে তার শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে?

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে আধুনিক হয়, যখন সে দুর্বল মানুষের অধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল অথচ সবচেয়ে মূল্যবান নাগরিক। তাদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

পুনর্ভর্তি ফি নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটানো তাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি হবে একটি স্পষ্ট বার্তা—বাংলাদেশে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নয়; এবং কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ আর কখনোই একটি অযৌক্তিক ফি রসিদের কাছে জিম্মি থাকবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net