July 21, 2026, 5:05 am

ড. আমানুর আমান
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক সত্য হলো—সরকার আসে ও যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু প্রশাসন যদি প্রতিবারই দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থা। এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ নতুন কোনো বিতর্ক নয়। দীর্ঘদিন ধরেই নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে গবেষক, সাবেক আমলা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রশ্নটি তাই কোনো একক সরকারকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্রের চরিত্রকে ঘিরে।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিক আমলাতন্ত্রের যে মডেল দিয়েছিলেন, তার ভিত্তি ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগ, আইনানুগ পরিচালনা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে এমন একটি প্রশাসনের ওপর, যা ব্যক্তির প্রতি নয়, আইনের প্রতি অনুগত। অপরদিকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উড্রো উইলসন তাঁর বিখ্যাত Politics–Administration Dichotomy তত্ত্বে বলেন, নীতি নির্ধারণ করবে নির্বাচিত সরকার, কিন্তু সেই নীতির বাস্তবায়ন করবে পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রশাসন। এই সীমারেখা ভেঙে গেলে প্রশাসন আর রাষ্ট্রের নয়; ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
প্রশাসনের রাজনীতিকরণকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রদাহ বলা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রদাহ প্রথমে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হলেও দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটিই শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতির কারণ হয়। প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক আনুগত্যকে দক্ষতার ওপরে স্থান দিলে প্রথমে সরকার কিছু সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর প্রথম ক্ষতি হয় মেধা ও পেশাদারিত্বে। যখন একজন কর্মকর্তা বুঝতে পারেন যে কর্মদক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা পদোন্নতির প্রধান শর্ত, তখন যোগ্যতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সততার পরিবর্তে আনুগত্যই হয়ে ওঠে সফলতার মানদণ্ড। এতে মেধাবী কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন এবং পুরো প্রশাসনের কর্মক্ষমতা কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয় নীতিনির্ধারণের মান। একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন সরকারের কাছে বাস্তব তথ্য, ঝুঁকি ও বিকল্প বিশ্লেষণ তুলে ধরে। কিন্তু দলীয়কৃত প্রশাসনে “অপছন্দনীয় সত্য” বলার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যায়। ফলস্বরূপ নীতিনির্ধারণে বাস্তবতার পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধা প্রাধান্য পায়।
তৃতীয়ত, দুর্বল হয় আইনের শাসন। যদি নাগরিকদের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বদলে যায়, তাহলে সংবিধানের সমতার নীতি কার্যত ক্ষুণ্ন হয়। রাষ্ট্র তখন আইনের দ্বারা পরিচালিত না হয়ে ব্যক্তি বা দলের প্রভাবাধীন বলে মনে হতে পারে।
চতুর্থত, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট হলে নির্বাচন, বিনিয়োগ ও অর্থনীতিও প্রভাবিত হয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন রাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্বানুমানযোগ্যতা, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক আস্থাকেও দুর্বল করে।
বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators-এ Government Effectiveness এবং Rule of Law সূচককে রাষ্ট্রের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একইভাবে Transparency International-এর দুর্নীতি ধারণা সূচকও দেখায়, যেখানে প্রশাসনিক জবাবদিহি দুর্বল, সেখানে দুর্নীতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যদিও এসব সূচক এককভাবে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ পরিমাপ করে না, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহির সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি বহুবার সুপারিশ করেছে। তাদের সুপারিশের মধ্যে ছিল—পদোন্নতি ও বদলিতে স্বচ্ছতা, কর্মদক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা জোরদার করা, এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবায়নের প্রশ্নে অগ্রগতি সবসময় প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনের দলীয়করণ, পদোন্নতি, বদলি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে জনপরিসর, সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বহু গবেষণা ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়াই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
একইভাবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিও একই নৈতিক মানদণ্ড প্রযোজ্য। নতুন সরকার যদি অতীতের বিতর্কিত চর্চা পরিহার করে মেধা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে, তবে সেটি হবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু যদি নিয়োগ, পদায়ন বা পদোন্নতিতে দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর হবে। জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন চায় না; তারা শাসনব্যবস্থার চরিত্রগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করে।
সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং নর্ডিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, সরকার পরিবর্তনের পরও স্থায়ী প্রশাসনের পেশাগত কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে। কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হয় কর্মদক্ষতা, সততা ও নেতৃত্বের ভিত্তিতে। ফলে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশেও এখন একটি নতুন সামাজিক চুক্তির প্রয়োজন। প্রশাসনের প্রতি আনুগত্য হবে সংবিধানের, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও কর্মদক্ষতা হবে একমাত্র মানদণ্ড। পিএসসির স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পদায়ন ও বদলিতে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। সংসদীয় কমিটি, মহাহিসাব নিরীক্ষক, তথ্য অধিকার আইন এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি আরও কার্যকর করতে হবে।
রাষ্ট্রের ইতিহাসে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিবর্তিত হয় না। আবার কখনও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই দ্বিতীয় পথটি খোলা রয়েছে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো সরকার নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের রাজনীতিকরণ সেই বিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আর নিরপেক্ষ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনই পারে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে। নতুন সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়; বরং এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজের পরিচয় দেবেন রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসেবে—কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস