July 29, 2026, 11:30 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ছয় বছর আগে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক-অর্থায়িত ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক (এন-৭) ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটে নির্মাণ অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশ এবং প্রথম লটে প্রায় ১০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ডিসেম্বর ২০২৬-এর পর বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন অব্যাহত রাখবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণে প্রাথমিক বিলম্ব থাকলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় জমি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি ও গাফিলতির কারণে নির্মাণকাজ কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ খুঁড়ে ফেলে রাখায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা ইতোমধ্যে কালীগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং সদর উপজেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিপূরণ প্রদান ও জমি হস্তান্তরের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুবীর কুমার দাশ বলেন, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি নেই; বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা দ্রুত দেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সূত্রের দাবি, বর্তমানে মূল বাধা ভূমি নয়, বরং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি। লট-২ ও লট-৩-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন বলেন, জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে জমি বুঝে পাওয়ার পরও ঠিকাদার কাজের গতি বাড়ায়নি। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটে এখন পর্যন্ত মাত্র ২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বারবার তাগিদ ও চিঠি দেওয়া হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে লট-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী বলেন, জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে শুরুতে কাজ এগোয়নি। তবে মার্চ ও জুলাই মাসে নতুন করে জমি বুঝে পাওয়ার পর এখন নির্মাণকাজের গতি বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার দাবি, প্রথম লটের প্রায় ১০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহ থেকে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
ধীরগতির নির্মাণকাজের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ ও পণ্য পরিবহন খাত। ভোমরা, বেনাপোল ও মোংলা বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান করিডর এই মহাসড়ক। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার বিভিন্ন অংশ খোঁড়াখুঁড়ি অবস্থায় পড়ে থাকায় যানজট, দুর্ঘটনা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বসির উদ্দীন বলেন, জেলা প্রশাসন জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে পুরো সড়ক এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার অভিযোগ, বড় বড় গর্তের কারণে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থ রোগীকেও সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকল্প সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘উইকেয়ার ফেজ-১’ কর্মসূচির আওতায় ঝিনাইদহ থেকে যশোরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চারটি মূল লেন ও দুটি সার্ভিস লেনসহ মোট ছয় লেনে উন্নীত করার প্রকল্প ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেকে অনুমোদন পায়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছিল ২ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা এবং সরকারের অংশ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে দ্বিতীয় দফায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৬২৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা করা হয় এবং মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে কাজের ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশনাল ডিরেক্টর জোঁ পেম এবং অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন গত ১৯ জুলাই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে জানান, বর্তমান অর্থায়নের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। এর পর অর্থায়নের মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ঝিনাইদহ-যশোর ছয় লেন মহাসড়ক প্রকল্প এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। দ্রুত নির্মাণকাজে গতি না এলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক পরিবহন করিডরের কার্যকারিতা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।