July 30, 2026, 12:20 pm

ড. আমানুর আমান
প্রতিবেশী বদলানো যায় না। তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কও কোনো সাময়িক রাজনৈতিক হিসাবের বিষয় নয়; এটি ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও তেমনই। একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় স্মৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন, অন্যদিকে রয়েছে অভিন্ন নদী, দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের মতো বাস্তব বিষয়। ফলে এই সম্পর্ক কখনোই একমাত্র আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; আবার কেবল স্বার্থের অঙ্ক দিয়েও এর গভীরতা ব্যাখ্যা করা যায় না।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বক্তব্য—“পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না, এমন কোনো সমস্যা নেই”—আসলে দুই দেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যেমন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, তেমনি কিছু বিষয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন, উদ্বেগ ও প্রত্যাশাও বেড়েছে। এসব প্রশ্নকে উপেক্ষা করে সম্পর্ক আরও গভীর হবে না; বরং খোলামেলা সংলাপই আস্থার নতুন ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন—“সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এই নীতি কেবল একটি কূটনৈতিক স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই নীতির আলোকে ভারত বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু, প্রতিবেশী এবং উন্নয়ন সহযোগী। তবে বন্ধুত্ব কখনো আত্মসমর্পণের নাম নয়; বন্ধুত্বের অর্থ পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা এবং একে অপরের জাতীয় স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল থাকা।
বাংলাদেশ আজ আর কেবল সহায়তার প্রত্যাশী একটি দেশ নয়। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, পোশাকশিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতিবেশী যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কও এখন আত্মবিশ্বাস ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
ভারতের জন্যও বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী নয়; দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি বিশাল বাজার, গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী এবং অবকাঠামোগত সহযোগী। অর্থাৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র একমুখী নয়; এটি দুই দেশের জন্যই লাভজনক।
তবে সম্পর্কের দৃঢ়তা পরীক্ষা হয় কঠিন বিষয়গুলোতে। সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কিংবা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য—এসব বিষয় বাংলাদেশের জনগণের কাছে সংবেদনশীল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে, তাদের ন্যায্য অধিকার, সার্বভৌমত্ব এবং মর্যাদা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। একইভাবে ভারতও তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একমাত্র পথ হলো নিয়মিত, আন্তরিক ও ফলপ্রসূ সংলাপ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ, রেল, সড়ক, নৌপথ, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এসব উদ্যোগ কেবল সরকার নয়, সাধারণ মানুষের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সহযোগিতা তখনই আরও টেকসই হবে, যখন উভয় দেশই সমানভাবে লাভবান হওয়ার অনুভূতি পাবে। কোনো সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদে একপাক্ষিক সুবিধার ভিত্তিতে টিকে থাকে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, লালন কিংবা বাংলা ভাষার ঐতিহ্য—সবই দুই দেশের জনগণকে একটি মানবিক বন্ধনে যুক্ত করেছে। ক্রিকেট, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সংগীত ও শিক্ষাক্ষেত্রেও পারস্পরিক বিনিময় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এই জনগণের সম্পর্কই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সময়েও স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
আজকের বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভূরাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারত যদি পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে পারে, তবে শুধু দুই দেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এর সুফল পাবে। আর যদি ভুল বোঝাবুঝি ও অবিশ্বাস বাড়ে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উভয় দেশের জনগণই।
তাই প্রয়োজন সম্পর্ককে আবেগ কিংবা সন্দেহ—কোনোটিরই বন্দি না করা। ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে, বর্তমানের বাস্তবতা মেনে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাতীয় স্বার্থে অটল থাকা, একই সঙ্গে প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আর ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশকে একটি সমমর্যাদার, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীন অংশীদার হিসেবে দেখা।
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য তাই একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। যদি সত্যিই বিশ্বাস করা হয় যে আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব, তবে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটতে হবে বাস্তব পদক্ষেপে। আস্থা তৈরি হবে প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমে, সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে, আর বন্ধুত্ব শক্তিশালী হবে তখনই, যখন দুই দেশের জনগণ অনুভব করবে—এই সম্পর্ক তাদের জীবনকে আরও নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ করছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোনো একক ঘটনার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে দুই দেশের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চেতনাও সেটিই বলে—বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ, জাতীয় মর্যাদা এবং জনগণের কল্যাণ। সেই নীতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর, আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং আরও টেকসই হয়ে উঠতে পারে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক. প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস