August 5, 2026, 11:45 am

ড. আমানুর আমান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি ছিল একটি নির্বাচনবিমুখ এক কেন্দ্রীক সরকারের বিরুদ্ধে অব্যাহত আন্দোলনের ফসল। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তবে ইতিহাসের এমন যুগান্তকারী ঘটনাকে বিচার করতে হলে আবেগ, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা তাৎক্ষণিক জনমতের পরিবর্তে প্রামাণ্য তথ্য, বাস্তবতা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং সামগ্রিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সমান গুরুত্ব দেওয়াই সমীচীন। তবেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ইতিহাস রচনা সম্ভব।
একটি বিষয় আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়—২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, কোনো একক সংগঠন কিংবা কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির একার অর্জন ছিল না। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চাপের মুখে ছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচি, গ্রেপ্তার, মামলা, কারাবরণ, দলীয় কার্যক্রমে বিধিনিষেধ—এসব বাস্তবতা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে, তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী সেই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণও করেন। আবার আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থী, তরুণ, পেশাজীবী, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ এবং নানা শ্রেণি-পেশার নাগরিক। তাই এ আন্দোলনের সাফল্যকে কেবল একটি গোষ্ঠীর কৃতিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তাই বলতে হবে, এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিরোধ, ছাত্রসমাজের সাহসী নেতৃত্ব, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ত্যাগ, সংগ্রাম ও সমর্থনের বহুমাত্রিক বহিঃপ্রকাশ। একটি গণ-আন্দোলন কখনোই শূন্য থেকে জন্ম নেয় না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, প্রতিরোধ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তাই এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে যদি কেবল একটি ব্যক্তি, একটি সংগঠন বা একটি পক্ষের কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা ইতিহাসের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে সংকুচিত করবে এবং অসংখ্য অজানা-অচেনা মানুষের অবদানকে আড়াল করবে। একটি দায়িত্বশীল ইতিহাসচর্চার দাবি হলো—যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই পরিবর্তনের পথে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া এবং ঘটনাকে তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বরাবরই পরিবর্তনের অগ্রদূত। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ইতিহাস এটাও বলে, ছাত্র আন্দোলন যখন বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়, তখন সেখানে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ একটি অপরিহার্য বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
র্তমান সরকার সেই আন্দোলনের পর উদ্ভূত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়েছে। আন্দোলনের সময় যে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা উচ্চারিত হয়েছিল, তা এখন আর কেবল একটি আন্দোলনের স্লোগান নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন উন্নয়নের পথকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। কারণ একটি গণ-আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানে দৃশ্যমান উন্নয়নের মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হয়।
লাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইনগত ভিত্তি। একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের মৌলিক অধিকার—জাতির পথচলার মৌলিক আদর্শ। এ দুটি পরস্পরের পরিপূরক; একটিকে অন্যটির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ বা যৌক্তিকতা নেই।
দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে একটি মহল ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। কখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে খাটো করে, আবার কখনও ২০২৪-এর আন্দোলনের তাৎপর্যকে অস্বীকার করে একটি কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমন প্রবণতা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করে না; বরং জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে দুর্বল করে। একটি জাতির ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন ও সংগ্রামের নিজস্ব প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং তাৎপর্য থাকে। সেগুলোকে প্রতিযোগিতার সম্পর্কের মধ্যে না দেখে ধারাবাহিক রাষ্ট্রগঠনের অভিযাত্রার অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করাই অধিকতর দায়িত্বশীল ও ইতিহাসসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি।
নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রায় তাই সংবিধানের প্রতি অটল শ্রদ্ধা, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এবং ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে উচ্চারিত বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকে সমন্বিত করেই এগিয়ে যেতে হবে। এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব—যেখানে ইতিহাস বিভাজনের নয়, বরং জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত হবে।
তবে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। জনগণ এখন বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করে, যেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকবে, প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বৈষম্য দূর করা আজকের বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সেবা এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও এর উপস্থিতি রয়েছে। একটি সত্যিকার উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছাতে হবে। শহর ও গ্রামের ব্যবধান, ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য—এসব কমিয়ে আনতে হবে।
একই সঙ্গে ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সহনশীলতা, সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া গণতন্ত্র কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না।
বর্তমান সরকারের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আন্দোলনের চেতনাকে শুধু আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রশাসনে স্বচ্ছতা, নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থা, মানবাধিকার সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস অর্জনই হতে পারে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
বাংলাদেশের মানুষ সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতা চায়; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চায়; বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্য চায়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের স্বার্থে কাজ করবে।
ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তন একদিন মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই আন্দোলনকে শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সুযোগ হিসেবে মূল্যায়ন করবে। সেই মূল্যায়নে কার কৃতিত্ব কতটুকু ছিল, তা ইতিহাস নির্ধারণ করবে; কিন্তু নতুন বাংলাদেশ কতটা ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক হলো, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অতএব, ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনকে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের অর্জন হিসেবে নয়, বরং বহু মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত ফসল হিসেবে দেখা উচিত। সেই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে, সংবিধানের নির্দেশনা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সমুন্নত রেখে বর্তমান সরকার যদি সুশাসন, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তবে বাংলাদেশ সত্যিই একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। সেটিই হবে আন্দোলনের প্রতি সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং জাতির ভবিষ্যতের জন্য সর্বোত্তম বিনিয়োগ।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস