September 11, 2026, 7:28 pm

নাজমুল ইসলাম, দৌলতপুর/
উজানের ঢল, সঙ্গে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে হঠাৎ প্লাবন দেখা দিয়েছে পদ্মায়।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে এক সপ্তাহে পদ্মায় পানি বেড়েছে ৮৮ সেন্টিমিটার। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এই বৃদ্ধি বিগত তিন বছরে মধ্যে সর্বোচ্চ।
পানি বৃদ্ধির সেই ঢেউ এখন আঘাত হেনেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার নদীবেষ্টিত রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নে। দুই ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে অধিকাংশ রাস্তাঘাট। কোথাও বাড়ির উঠান, কোথাও বসতঘরের চারপাশ, আবার কোথাও পুরো বাড়িই এখন পানির মধ্যে। স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবারের চলাচলের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে ডিঙি ও ছোট নৌকা।
পানি ঢুকে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই ইউনিয়নের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে সরাসরি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এসব বিদ্যালয় ভবন বন্ধ করে দেওয়া হয়নি; পানিবন্দি মানুষ প্রয়োজনে যাতে সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য ভবনগুলো খোলা রাখা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মাত্র এক সপ্তাহে নদীর পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার।
বৃহস্পতিবার বিকেলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপৎসীমার প্রায় ৯২ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। বর্তমানে নদীর পানি রয়েছে ১৩ মিটারের আশপাশে। বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পদ্মার পানি বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং অতিরিক্ত বৃষ্টি। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যেও উজানের পানির বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে রয়েছে ভিন্ন আলোচনা। তাদের দাবি, ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ার পর উজানের পানি ও বৃষ্টির পানি একসঙ্গে নেমে আসায় পদ্মার পানি দ্রুত বেড়েছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যে নদীসংলগ্ন চর ও নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
যদিও ফারাক্কা বাঁধের পানি ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কোনো তথ্য দেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, উজানের ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টিই বর্তমান পানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
রামকৃষ্ণপুরে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মন্ডল বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ২০ থেকে ২৩টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে গেছে। যেসব বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের নৌকার মাধ্যমে তুলনামূলক নিরাপদ ও উঁচু এলাকায় নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের চলাচলের প্রধান অবলম্বন এখন ডিঙি ও ছোট নৌকা। বেশ কিছু বাড়িঘর সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির চারপাশে পানি উঠে গেছে।
চিলমারীতে বাড়ির চারপাশে পানি, ডুবেছে প্রায় সব রাস্তা
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান উদ্দিন বলেন, ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। এতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ইতিমধ্যে ইউনিয়নের প্রায় সব রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে পুরো ইউনিয়নের মানুষই অনেকটা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ইউনিয়নের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়েছে।
মান্নান উদ্দিন বলেন, পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী এক দিনের মধ্যে আরও অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি জানান, গত বুধবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত
পানি শুধু বসতভিটা ও সড়কেই থেমে নেই; এর প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।
এসব জমিতে থাকা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে কৃষিখাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাবার পানি ও গো-খাদ্য নিয়ে নতুন শঙ্কা
পানিবন্দি মানুষের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিশুদ্ধ পানি, খাবার এবং গো-খাদ্য নিয়ে। পানি আরও বাড়লে এসব সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বিদ্যালয় বন্ধ, ভবন খোলা
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুশতাক আহমেদ ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারুক আহমেদ বলেন, চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাটও ডুবে গেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের স্কুলে আসা বন্ধ রেখেছেন।
তবে বিদ্যালয়ে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান তাঁরা। একই সঙ্গে পানিবন্দি মানুষ যাতে প্রয়োজনে বিদ্যালয় ভবনে আশ্রয় নিতে পারেন, সেই সুযোগও রাখা হয়েছে।
১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়তে পারে পানি
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মার পানি বেড়েছে। প্রতিবছরই দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে পদ্মার পানি ১৩ মিটারের আশপাশে রয়েছে। বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে পদ্মার পানি আরও বাড়লে দুর্গত মানুষের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ—দুটিই বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
ছবি: পানিতে প্লাবিত রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের চারপাশের দৃশ্য।