September 20, 2026, 7:03 am

ড. আমানুর আমান
একটি রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের কত টাকা বেতন দেবে—প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, মানুষের জীবনযাত্রা, বাজারব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি, রাজস্বনীতি, প্রশাসনের দক্ষতা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন। তাই নতুন পে-স্কেল কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি অর্থনীতির ওপরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পুরো বেতন একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না; তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হওয়ার কথা। বর্ধিত ভাতার সুবিধা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—এই নতুন পে-স্কেলের ভালো দিক কোথায়, আর উদ্বেগের জায়গাগুলোই বা কোথায়?
প্রথমত, এটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের একটি প্রচেষ্টা
গত এক দশকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সেই অনুপাতে নিয়মিত পুনর্নির্ধারিত হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামোর মধ্যে থাকা কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক এখানেই। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা হওয়া শুধু একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; নিম্ন আয়ের একজন কর্মচারীর জন্য এটি খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা সন্তানের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে বাস্তব পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে বেতন কাঠামোকে বাস্তব জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি রাষ্ট্রের কর্মচারীরা যদি ক্রমাগত আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তাহলে তাদের পেশাগত মনোযোগ ও কর্মপ্রেরণাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, পে-স্কেল শুধু কর্মচারীর আয় নয়, অর্থনীতির চাহিদাও বাড়াতে পারে
সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তারা বেশি পণ্য ও সেবা কিনবেন, বাড়তি অর্থের একটি অংশ সঞ্চয় করবেন এবং একটি অংশ বাজারে ব্যয় করবেন। ফলে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে।
এই দিক থেকে দেখলে নতুন পে-স্কেল অর্থনীতিতে একটি প্রণোদনামূলক প্রভাবও তৈরি করতে পারে। দোকান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হতে পারে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়ে, তাহলে চাহিদার চাপ মূল্যস্ফীতিতেও রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ বেতন বাড়ানোর সুফল যেন বাজারদরের বৃদ্ধিতে আবার ক্ষয়ে না যায়, সেটিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয়ত, পেনশনভোগীদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
নতুন কাঠামোর সুবিধা বিদ্যমান পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। প্রায় সোয়া নয় লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী নতুন কাঠামোর আওতায় আসবেন বলে সরকার জানিয়েছে।
এটি সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর একজন মানুষের আয় সাধারণত কমে যায়, অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় অনেক সময় বাড়ে। ফলে পেনশন কাঠামোর সঙ্গে বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য রাখা অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু স্বস্তির এই অঙ্কের বিপরীতে আছে রাষ্ট্রের ব্যয়ের প্রশ্ন
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা সম্ভবত এখানেই।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং পেনশনভোগীরা এর আওতায় আসবেন।
একটি পরিবারের আয় বাড়লে যেমন তার ব্যয় পরিকল্পনার প্রশ্ন আসে, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। সরকারের আয় কত, ব্যয় কত, রাজস্ব আদায় কতটা সম্ভব, ঋণের বোঝা কতটা—এসব বিবেচনা করেই দীর্ঘমেয়াদি বেতন কাঠামো টেকসই করতে হয়।
নতুন পে-স্কেলের অর্থ কোথা থেকে আসবে—এই প্রশ্নটি তাই অস্বস্তিকর হলেও জরুরি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পে-স্কেল বাস্তবায়নের অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান নিয়ে রাজস্ব আহরণের ওপর জোর দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
রাষ্ট্র যদি দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব বাড়াতে পারে, করের আওতা সম্প্রসারণ করতে পারে এবং অপচয় কমাতে পারে, তাহলে বর্ধিত বেতন দীর্ঘমেয়াদে সামলানো তুলনামূলক সহজ হবে। কিন্তু রাজস্ব আয় যদি প্রত্যাশিত হারে না বাড়ে, তাহলে একই সঙ্গে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলোও অর্থের জন্য প্রতিযোগিতায় পড়বে।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পে-স্কেলের সম্পর্ক
বেতন বাড়লেই যে জীবনযাত্রার মান একই অনুপাতে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ধরা যাক, একজন কর্মচারীর বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ল। কিন্তু একই সময়ে যদি খাদ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়, তাহলে তার প্রকৃত আয় কতটা বাড়ল—সেটিই আসল প্রশ্ন।
অর্থনীতির ভাষায় নামমাত্র আয় এবং প্রকৃত আয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। পে-স্কেল নামমাত্র আয় বাড়ায়; কিন্তু প্রকৃত জীবনযাত্রার উন্নতি নির্ভর করে সেই আয়ে কত পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে তার ওপর।
তাই নতুন পে-স্কেলের সাফল্য শুধু বেতন বৃদ্ধির শতাংশ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা সফলতা আসে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ধাপে বাস্তবায়ন—সমাধান নাকি অপেক্ষার নতুন অধ্যায়?
সরকার একবারে পুরো পে-স্কেল কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি যৌক্তিকতা আছে। এতে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় ব্যয়ের চাপ পড়ে না এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা কিছুটা সহজ হতে পারে।
কিন্তু কর্মচারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। নতুন বেতন কাঠামো ঘোষিত হলেও পূর্ণ সুবিধা পেতে তাদের ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আবার ভাতার সংশোধিত সুবিধার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।
অর্থাৎ কাগজে বেতন বৃদ্ধি আজ ঘোষিত হলেও বাস্তব জীবনে তার পূর্ণ প্রতিফলন আসতে সময় লাগবে।
সরকারি-বেসরকারি বেতন বৈষম্যও ভাবতে হবে
আরেকটি বিষয় উপেক্ষা করা উচিত নয়। দেশে সরকারি চাকরির বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেসরকারি খাতে কাজ করেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তাদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় যদি একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যখন বাজারের বাড়তি চাহিদার কারণে বাড়িভাড়া, পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন বেতন বৃদ্ধির বাইরে থাকা মানুষদের ওপর পরোক্ষ চাপ পড়তে পারে।
এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে শুধু সরকারি বেতন কাঠামো নয়, দেশের সামগ্রিক মজুরি কাঠামো, উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান নিয়েও ভাবতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: বেতনের সঙ্গে কি দায়িত্বও বাড়বে?
এখানে এসে নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে।
একজন সরকারি কর্মচারী রাষ্ট্রের অর্থে বেতন পান। সেই অর্থের উৎস জনগণের কর ও রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়। অতএব বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই সম্মানজনক জীবনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে; কিন্তু এর সঙ্গে জনসেবার মান, দক্ষতা, জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতার প্রত্যাশাও যুক্ত থাকা স্বাভাবিক।
বেতন বাড়বে, কিন্তু সেবার মান বাড়বে না—এমন সমীকরণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরে গেলে দ্রুত সেবা পাবেন, হয়রানি কমবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা থাকবে, অফিসে কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার হবে—নতুন বেতন কাঠামোর সাফল্য শেষ পর্যন্ত এসব বাস্তব সূচক দিয়েও পরিমাপ করতে হবে।
শেষ কথা
নতুন পে-স্কেলকে তাই একমাত্রিক চোখে দেখা ঠিক হবে না। এটি একদিকে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক প্রত্যাশা পূরণের উদ্যোগ; অন্যদিকে রাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক দায়ও।
বেতন বাড়ানো প্রয়োজন—কিন্তু সেই বেতন যেন মূল্যস্ফীতিতে হারিয়ে না যায়। কর্মচারীর জীবনযাত্রা উন্নত হওয়া প্রয়োজন—কিন্তু তার জন্য রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতা যেন দুর্বল না হয়। সরকারি চাকরি আকর্ষণীয় হওয়া প্রয়োজন—কিন্তু একই সঙ্গে বেসরকারি খাত ও সামগ্রিক শ্রমবাজারের ভারসাম্যও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, বেতন বৃদ্ধি যেন শুধু বেতন বৃদ্ধিতে থেমে না থাকে। এর সঙ্গে যদি দক্ষতা বাড়ে, সেবার মান বাড়ে, জবাবদিহি বাড়ে এবং নাগরিকের সময় ও অর্থের মূল্যায়ন বাড়ে—তবেই নতুন পে-স্কেল তার পূর্ণ অর্থ পাবে।
রাষ্ট্রের কর্মচারীর মর্যাদা রক্ষা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই দুই দায়িত্বের মাঝখানে যে ভারসাম্য—নতুন পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত সেখানেই নিহিত।
কারণ একটি ভালো বেতন কাঠামো শুধু কর্মচারীর পকেট ভারী করে না; এটি রাষ্ট্রের সেবাকে আরও দক্ষ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে সাহায্য করে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাক্ষর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস।