April 14, 2026, 5:37 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন সূর্যের আলোয় ভেসে ওঠা এক আনন্দঘন সকাল। ঢাকার রমনা বটমূল—যেখানে প্রতি বছর বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রাণস্পন্দন ছড়িয়ে পড়ে—সেই স্থানই একদিন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। ২০০১ সালের সেই ভয়াবহ সকাল আজও বাঙালির স্মৃতিতে এক অমোচনীয় ক্ষত হয়ে আছে।
২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। সময় এগিয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে, বৈশাখ এসেছে বারবার। কিন্তু রমনা বটমূলে বোমা হামলার বিচার আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি—এই বাস্তবতা যেন উৎসবের আনন্দের ভেতরেও এক নীরব বেদনার সুর তুলে দেয়।
উৎসব থেকে আতঙ্কে/
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই রমনা পার্কে জড়ো হতে থাকেন নানা বয়সের মানুষ। ছায়ানটের আয়োজনে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল যথারীতি। গান, কবিতা আর বাঙালিয়ানা—সব মিলিয়ে চারদিকে ছিল এক নির্মল উৎসবের আবহ।
কিন্তু কেউ জানত না, সেই আনন্দমুখর ভিড়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে মৃত্যু।
সকাল ৮টা ৫ মিনিট। হঠাৎ এক বিকট বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় সবকিছু। মানুষের চিৎকার, ছুটোছুটি, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া চারপাশ—উৎসবের মঞ্চ পরিণত হয় বিভীষিকার দৃশ্যে।
এর কিছুক্ষণ পর আবারও আরেকটি বিস্ফোরণ। আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ে।
সেদিন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৯ জন। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়। অসংখ্য আহত মানুষ, রক্তাক্ত শরীর আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় সকাল।
এই হামলাকে অনেকে শুধুমাত্র একটি সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে দেখেন না; এটি ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনাকে আঘাত করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
পরে তদন্তে উঠে আসে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সংশ্লিষ্টতা। মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জনকে আসামি করে দায়ের করা হয় দুটি মামলা—একটি হত্যা এবং অন্যটি বিস্ফোরক আইনে।
বিচারের দীর্ঘ পথচলা
বিচারের পথ শুরু হলেও তা কখনোই মসৃণ হয়নি। বছরের পর বছর কেটে গেছে শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ আর আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায়।
২০১৪ সালে নিম্ন আদালত রায় ঘোষণা করে—কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড, কয়েকজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পরে হাইকোর্টে সেই রায়ের পরিবর্তন আসে, কিছু সাজা কমানো হয়, কিছু বহাল থাকে।
তবুও মামলাটি শেষ হয়নি। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়। এরপর আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মামলার শেষ পরিণতি।
অন্য মামলাটি এখনো চলমান
একই ঘটনার বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটি এখনো নিম্ন আদালতে বিচারাধীন।
২৫ বছর পরও মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হলেও প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এরপর যুক্তি-তর্ক, তারপর রায়—অর্থাৎ শেষ হতে এখনো বাকি অনেকটা পথ।
এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত মামলার নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগছে?
আইনজীবীরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে শুনানি না হওয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মামলার বহুমাত্রিকতা—সব মিলিয়েই বিলম্বের কারণ। তবে ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে এসব ব্যাখ্যা যেন খুবই ক্ষীণ সান্ত্বনা।
উৎসবের ভেতরে এক অদৃশ্য শোক
আজও যখন পহেলা বৈশাখ আসে, রমনা বটমূল নতুন করে সাজে। নিরাপত্তা জোরদার হয়, মানুষ ভিড় করে, গান বাজে—উৎসব ফিরে পায় তার চিরচেনা রূপ।
তবুও কোথাও যেন রয়ে যায় এক অদৃশ্য শোকের রেখা।
কারণ, ২০০১ সালের সেই সকাল শুধু একটি দিন নয়—এটি একটি স্মৃতি, একটি ক্ষত, এবং এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম।
২৫ বছর পরও বিচার শেষ না হওয়া সেই প্রতীক্ষাকে আরও দীর্ঘ করে তুলেছে। আর তাই, বৈশাখের আনন্দের মাঝেও প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে—এই বিচার শেষ হবে কবে?