May 23, 2026, 7:17 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম
চলতি বছরেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ১৯৯৬ সালে ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি। তিন দশক ধরে কার্যকর থাকা এ চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন শুধু কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, পানি নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সক্ষমতার এক জটিল পরীক্ষায়। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে নীতিনির্ধারণী মহল—সবখানেই এখন প্রশ্ন একটাই: বর্তমান বাস্তবতায় এই চুক্তির নবায়ন আদৌ সম্ভব কি না। একটি পক্ষ মনে করে, বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষে ভারতের সঙ্গে এমন একটি স্পর্শকাতর সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না। কারণ যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আস্থার পরিবেশে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, আজকের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সেই জায়গায় নেই। দুই দেশের মধ্যে এখন সম্পর্ক অনেক বেশি সতর্ক, হিসাবনির্ভর এবং কৌশলগত বাস্তবতায় আবদ্ধ। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ মনে করে, গঙ্গা শুধু আবেগ বা রাজনীতির প্রশ্ন নয়; এটি দুই দেশের পারস্পরিক প্রয়োজন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। ফলে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো সমঝোতার পথ দুই দেশকেই খুঁজতে হবে।
উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই ফিরে যেতে হবে ১৯৯৬ সালের প্রেক্ষাপটে। তখনকার দক্ষিণ এশিয়া ছিল ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। সদ্য ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে দিল্লির রাজনৈতিক বোঝাপড়া দ্রুত তৈরি হয়েছিল। ভারত সে সময় বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদি পানি নিশ্চয়তার জন্য একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে আগ্রহী ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ, এমনকি জনমতের প্রশ্নও। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য আগের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চকিত। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক ও মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভারতবিরোধিতাকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এখন অনেক বেশি প্রভাবশালী। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আগের মতো আবেগ বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে এগোচ্ছে না; বরং কঠোর বাস্তববাদ ও কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বর্তমান দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির বাস্তবতায় নদীর পানি শুধু “পানি” তে নেই। এটি এখন সীমান্ত, নিরাপত্তা, কৌশলগত প্রভাব ও আঞ্চলিক ক্ষমতার রাজনীতির অংশে পরিণত হয়েছে।
এখানেই বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জটি বড় হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিকভাবে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বিএনপিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। এর পেছনে অতীতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, সীমান্ত রাজনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব কাজ করেছে। যদিও বর্তমান বাস্তবতায় ভারত কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে নীতি পরিচালনা করতে পারবে না, তবুও দিল্লি এখনো বাংলাদেশে একটি “predictable partner” খোঁজে। ফলে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ হবে ভারতের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো যে, সরকার পরিবর্তন হলেও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ধারাবাহিকতা ভাঙবে না।
তবে এটাও সত্য, বাংলাদেশের অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য বেড়েছে। বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ, ট্রানজিট, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। ফলে ভারতও চাইলেই বাংলাদেশকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
এই বাস্তবতা বিএনপি সরকারের জন্য একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে পরীক্ষা।
গঙ্গা চুক্তির আলোচনায় সবচেয়ে বড় জটিলতা হচ্ছে “পানির ভিত্তি” নিয়ে মতপার্থক্য। বর্তমান চুক্তিতে ফারাক্কা পয়েন্টে যতটুকু পানি থাকবে, সেটিই ভাগাভাগির ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশের দাবি হলো, ফারাক্কার আগেই ভারতের উজানে অসংখ্য বাঁধ ও ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হয়। ফলে প্রকৃত ন্যায্য হিস্যা নির্ধারণ করতে হলে পুরো গঙ্গা অববাহিকার প্রবাহ বিবেচনায় নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের এই দাবি অযৌক্তিক নয়। বরং আধুনিক পানি কূটনীতিতে এখন “বেসিনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা” ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ভারত গঙ্গাকে শুধু একটি নদী হিসেবে দেখে না; এটি তাদের খাদ্য, কৃষি ও কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ। ফলে তারা সহজে নিজেদের উজানের তথ্য ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উন্মুক্ত করতে আগ্রহী নয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা আছে।
প্রথম পথ হলো বর্তমান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো। বাস্তববাদীরা মনে করেন, এটিই সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প। কারণ এতে অন্তত বিদ্যমান কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং পানির একটি ন্যূনতম নিশ্চয়তা বজায় থাকবে। পদ্মা ব্যারাজের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় পথ হলো নতুন ও উন্নত চুক্তির চেষ্টা। এখানে বাংলাদেশ হয়তো ১৯৭৭ সালের “গ্যারান্টি ক্লজ” পুনর্বহালের দাবি তুলতে পারে, যাতে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে পুরো গঙ্গা অববাহিকাকে বিবেচনায় নেয়ার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। কিন্তু এতে আলোচনার জটিলতা অনেক বেড়ে যাবে এবং ভারত পাল্টা কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
তৃতীয় পথ হলো আন্তর্জাতিকীকরণ। অর্থাৎ বাংলাদেশ জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক নদী আইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে। কিন্তু ভারত ঐতিহ্যগতভাবেই আন্তঃসীমান্ত নদী সমস্যাকে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর বাইরে নিতে চায় না। ফলে এই পথ কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারলেও তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ। যদি গঙ্গা চুক্তিকে শুধুমাত্র “ভারতপন্থী” বা “ভারতবিরোধী” রাজনীতির চশমায় দেখা হয়, তাহলে বাস্তবসম্মত সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ পানি কেবল কূটনীতির প্রশ্ন নয়; এটি কৃষি, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনজীবনের প্রশ্ন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষই।
তাই প্রয়োজন আবেগ নয়, পরিণত রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা।
বাংলাদেশকে একদিকে নিজের ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নে দৃঢ় থাকতে হবে, অন্যদিকে বাস্তবতার মাটিতেও দাঁড়াতে হবে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় হয়তো একেবারে নতুন ও আদর্শ চুক্তি সম্ভব নয়। কিন্তু বিদ্যমান চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে আরো ন্যায্য কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এখন বিকল্প প্রস্তুতির আলোচনা বাড়ছে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প তারই অংশ। কারণ গঙ্গার পানিপ্রবাহ ক্রমাগত কমতে থাকলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও জীববৈচিত্র্যের সংকট আরো তীব্র হবে। পদ্মা ও গড়াই নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ইতোমধ্যেই তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু কিউসেকের অঙ্কে নির্ধারিত হবে না। এটি নির্ভর করবে রাজনৈতিক আস্থা, কৌশলগত বাস্তবতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও দুই দেশের নেতৃত্ব কতটা দূরদর্শিতা দেখাতে পারে তার ওপর। বাংলাদেশকে একদিকে যেমন বাস্তববাদী হতে হবে, অন্যদিকে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে দৃঢ় অবস্থানও নিতে হবে। কারণ গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়; এটি ইতিহাস, ভূরাজনীতি এবং দুই দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রবহমান বাস্তবতা।