March 4, 2026, 5:08 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দৈনিক কুষ্টিয়া অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঈশ্বরদী–ঢালারচর রেলপথ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাবনা রেলওয়ে স্টেশন এখন রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থ বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
২০১৮ সালে উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটি স্থানীয় জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত এই আধুনিক স্থাপনা ধীরে ধীরে অব্যবহৃত ও অরক্ষিত অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্টেশনটির অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। সন্ধ্যার পর স্টেশন চত্বর কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন এলাকায় পরিণত হয়। স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ, মাদকসেবীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং প্রকাশ্যে মাদক সেবনের ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। প্ল্যাটফর্ম, বুকিং কাউন্টার এবং শৌচাগারের আশেপাশে ব্যবহৃত সিরিঞ্জসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
স্টেশন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকল্পটির বড় দুর্বলতা। বর্তমান জনবল কাঠামো অনুযায়ী এত বড় অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েকজন কর্মী দিয়ে স্টেশন পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা যায়, স্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক ও অবকাঠামোগত উপাদান চুরির ঘটনাও ঘটেছে। দরজার থাই অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম, বৈদ্যুতিক ফ্যান এবং অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করছে। পানি সরবরাহের সাবমারসিবল পাম্পের যন্ত্রাংশ পর্যন্ত খুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বর্তমানে স্টেশনে সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা নেই।
রাতে স্টেশন এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় পুরো চত্বর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এই পরিবেশ অপরাধপ্রবণ কার্যকলাপের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে।
স্থানীয় জনগণের একটি অংশ মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়নি। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই উন্নয়ন সম্পন্ন হয় না—বরং সেটির নিরাপত্তা, জনবল নিয়োগ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচক মহলের মতে, পরিবর্তিত প্রশাসনিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প চালুর পর যদি পরিচালন কাঠামো শক্তিশালী না হয়, তবে বিপুল অর্থের বিনিয়োগ জনগণের প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
বর্তমান প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্টেশনে ট্রেন চলাচলের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়লে স্টেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে এবং জনবল সংকট কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধুমাত্র ট্রেন সংখ্যা বাড়ানোই নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান নয়।
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় নীতি-পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতার একটি প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।