May 13, 2026, 3:24 am

ড.আমানুর আমানের কলাম 
পদ্মার তীর ঘেঁষে পাবনার ঈশ্বরদীতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত স্বপ্নগুলোর একটি—Rooppur Nuclear Power Plant। বিশাল গম্বুজ, উঁচু ক্রেন আর নিরাপত্তাবেষ্টিত সেই স্থাপনাকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশ যেন উন্নয়নের এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে। কিন্তু এই স্বপ্নের মাঝেই বারবার উঠেছে একটি প্রশ্ন—রূপপুরের ব্যয় এত বেশি কেন? পার্শ্ববর্তী দেশের একই ধরনের পারমাণবিক প্রকল্পের তুলনায় কি সত্যিই বাংলাদেশ অনেক বেশি খরচ করেছে?
এই প্রশ্ন শুধু অর্থনীতির নয়; এটি রাজনীতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও জাতীয় আত্মমর্যাদার সঙ্গেও জড়িত।
বাংলাদেশ যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করছিল। শিল্পকারখানা, নগরায়ন এবং দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রেক্ষাপটে রূপপুর প্রকল্পকে দেখা হয়েছিল ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে।
কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় ঘোষণার পর থেকেই আলোচনা শুরু হয়। প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পকে অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল পারমাণবিক উদ্যোগগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন। তুলনা চলে ভারতের Kudankulam Nuclear Power Plant–এর সঙ্গে, যেখানে রাশিয়ান প্রযুক্তিতেই নির্মিত ইউনিটগুলোর প্রতি মেগাওয়াট ব্যয় তুলনামূলক কম।
এক চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী একদিন এই বিষয়েই আলোচনা করছিল। একজন বলল, “ভারত যদি কম খরচে পারে, তাহলে আমরা কেন পারলাম না?” আরেকজন উত্তর দিল, “সব দেশের বাস্তবতা এক না।”
সত্যিই, বাস্তবতা এক নয়।
ভারতের কুডানকুলাম প্রকল্পের ইতিহাস অনেক পুরোনো। সেখানে ধাপে ধাপে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। প্রথম ইউনিট নির্মাণের সময় যে ব্যয় হয়েছে, পরবর্তী ইউনিটগুলোতে তার সুবিধা পাওয়া গেছে। রাস্তা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা—সবকিছু আগেই প্রস্তুত ছিল। ফলে নতুন ইউনিট যোগ করতে তুলনামূলক কম খরচ হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রূপপুর ছিল দেশের প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প। এখানে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, পুরো একটি নতুন প্রযুক্তিগত সংস্কৃতি তৈরি করতে হয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, জরুরি সাড়া ব্যবস্থাপনা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই নতুন করে গড়ে তুলতে হয়েছে।
পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকার ভূ-প্রকৃতিও বড় একটি কারণ। নরম মাটিতে বিশাল পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ভিত্তি শক্তিশালীকরণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ধরনের প্রকল্পে নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য আপসও বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে খরচ বেড়েছে।
তবে সমালোচকরাও চুপ ছিলেন না।
অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তাদের মতে, বিদেশি ঋণের সুদের চাপ, যন্ত্রপাতি আমদানির খরচ এবং দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্পকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, পরিকল্পনার স্বচ্ছতা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।
একজন সাবেক প্রকৌশলী এক টেলিভিশন আলোচনায় বলেছিলেন, “বাংলাদেশ প্রযুক্তি কিনেছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা কিনতে পারেনি।” কথাটি গভীর। কারণ উন্নত প্রযুক্তি শুধু যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না; এটি দক্ষ মানবসম্পদ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত।
অন্যদিকে সরকার ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, রূপপুরকে শুধু ব্যয়ের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। তারা বলেন, এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি বিশাল অগ্রগতি। ভবিষ্যতে দেশের শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।
একজন তরুণ প্রকৌশলী, যিনি রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে রূপপুরে কাজ করছেন, বলছিলেন, “আমরা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছি না; আমরা নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করছি।”
এই বক্তব্যের মধ্যেও বাস্তবতা আছে। কারণ পারমাণবিক প্রকল্প সাধারণ অবকাঠামো প্রকল্পের মতো নয়। এটি একটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। বিশ্বের অনেক দেশ পারমাণবিক শক্তিকে কৌশলগত সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও দেখে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটি অনেক সহজ—এত টাকা খরচ করে লাভ কী?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে ভবিষ্যতের ওপর। যদি রূপপুর সফলভাবে দীর্ঘদিন নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, তাহলে ব্যয়ের বড় অংশই যৌক্তিক মনে হতে পারে। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম কার্বন নিঃসরণ করে এবং বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম।
কিন্তু যদি উৎপাদন ব্যাহত হয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যায় বা ঋণের চাপ অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে, তাহলে সমালোচনার মাত্রাও বাড়বে।
ভারত, চীন কিংবা রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো অর্থনৈতিক স্কেল। বড় অর্থনীতিগুলো বিশাল শিল্পভিত্তি ও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতার কারণে অনেক যন্ত্রাংশ নিজেরাই তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশকে অধিকাংশ প্রযুক্তি ও উপকরণ আমদানি করতে হয়েছে। ফলে ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
এখানে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও কাজ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। মানুষ চায় দ্রুত ফলাফল, কম ব্যয় এবং দৃশ্যমান সাফল্য। কিন্তু বাস্তবে বড় প্রযুক্তিগত প্রকল্পে অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয় খুবই সাধারণ ঘটনা। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও পারমাণবিক প্রকল্প নির্ধারিত বাজেট ছাড়িয়ে গেছে।
তবু রূপপুরকে ঘিরে বিতর্ক থামছে না। কেউ এটিকে বাংলাদেশের সাহসী অগ্রযাত্রা বলেন, কেউ আবার একে “অতিরিক্ত ব্যয়ের উন্নয়ন” হিসেবে দেখেন।
এক বিকেলে রূপপুরের পাশের গ্রামের এক বৃদ্ধ বলছিলেন, “আগে এখানে শুধু মাঠ ছিল। এখন বিদেশিরা আসে, বড় বড় গাড়ি চলে। আমাদের এলাকাও বদলাইছে।”
এই পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রূপপুর প্রকল্পের আরেকটি দিক। এটি শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও অংশ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো শুধু “খরচ বেশি কি না”–এ সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এই ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারবে?
যদি পারে, তাহলে রূপপুর ভবিষ্যতে দেশের প্রযুক্তিগত আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠবে। আর যদি না পারে, তাহলে এটি ইতিহাসে থেকে যাবে এক ব্যয়বহুল স্বপ্ন হিসেবে।
সময়ই সেই উত্তর দেবে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস