September 15, 2026, 1:13 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
উষ্ণ আলিঙ্গনের আড়ালে ব্রিকসের শীতল হিসাব জালিয়াতির অভিযোগে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তন ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিকস সম্মেলন শেষে মোদি-শি বৈঠকে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বার্তা ডেঙ্গু: আতঙ্কের চেয়ে বড় যে প্রশ্নটি পদ্মায় তীব্র স্রোত/ দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌপথে সর্বোচ্চ সতর্কতা ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামেও ডেঙ্গুর বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা পদ্মায় হঠাৎ প্লাবন: দুই ইউনিয়নে ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি, বন্ধ ২৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দলীয় প্রতীক ও মনোনয়ন নেই, ‘বৈধ প্রার্থী’ হলে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ থাপ্পরকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই পরীক্ষায় অসদুপায়ে ধরা ইবির সেই ছাত্রদল কর্মী

উষ্ণ আলিঙ্গনের আড়ালে ব্রিকসের শীতল হিসাব

ড. আমানুর আমান

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন শেষ হয়েছে। শেষ দিনের ছবিগুলোতে ছিল করমর্দন, আলিঙ্গন, হাসিমুখ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক উষ্ণ আবহ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছেন, কথা বলেছেন, ছবি তুলেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই সময়ে এমন দৃশ্য নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যযুদ্ধ, সীমান্তবিরোধ এবং পরস্পরকে ঘিরে অবিশ্বাসের পৃথিবীতে কয়েকটি বড় শক্তি একই টেবিলে বসে কথা বলছে—এটিও কম অর্জন নয়।
তবে কূটনীতির ছবিতে যতটা উষ্ণতা থাকে, তার অন্তরালে থাকে ততটাই শীতল হিসাব। রাষ্ট্রপ্রধানদের হাসি দেখে রাষ্ট্রের স্বার্থ বোঝা যায় না; করমর্দনের দৃশ্য দেখে বোঝা যায় না কোন দেশ কতটা লাভবান হলো। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের ভাষা যতই কোমল হোক, তার ব্যাকরণটি শেষ পর্যন্ত স্বার্থের।
এই কারণেই নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনকে শুধু সফল একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন কিংবা পরস্পরের প্রতি সৌজন্য প্রদর্শনের সম্মেলন হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়বে না। আবার এটিকে এমন কোনো ভূকম্পন হিসেবেও দেখার কারণ নেই, যার ফলে সম্মেলন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং নতুন একটি ব্যবস্থা জন্ম নিয়েছে। বাস্তবতা বরং মাঝামাঝি—ব্রিকস ক্রমশ একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে, কিন্তু এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারেনি।
নয়াদিল্লি ঘোষণার ১৪০টি অনুচ্ছেদে বহুপাক্ষিকতা, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান, উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো বিস্তৃত বিষয় স্থান পেয়েছে। ঘোষণার ব্যাপ্তি থেকেই বোঝা যায়, ব্রিকস আর আগের সেই চার-পাঁচটি দেশের সীমিত অর্থনৈতিক সমন্বয়ের কাঠামো নেই। এর পরিধি বেড়েছে, সদস্য বেড়েছে, স্বার্থের বৈচিত্র্য বেড়েছে এবং সেই সঙ্গে বেড়েছে এর রাজনৈতিক গুরুত্বও।
কিন্তু এখানেই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে সংগঠনটি বিশ্বব্যবস্থায় অধিকতর বহুপাক্ষিকতার কথা বলে, তার ভেতরেই রয়েছে এমন সব রাষ্ট্র, যাদের নিজেদের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধ রয়েছে। ভারত ও চীন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা আছে, এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা আছে, বাণিজ্যে অসমতা নিয়ে অভিযোগ আছে; আবার একই সঙ্গে দুজনেই জানে, একে অপরকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলার মতো অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক বিলাসিতা তাদের নেই। ফলে ব্রিকসের টেবিলে ভারত-চীনের পাশাপাশি বসা কোনো বন্ধুত্বের চূড়ান্ত ঘোষণা নয়; এটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও যোগাযোগের দরজা খোলা রাখার বাস্তববাদী কূটনীতি।
এই বাস্তববাদেই এবারের সম্মেলনে ভারতের লাভ সবচেয়ে স্পষ্ট। ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে; চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও চীনের সঙ্গে একই বহুপাক্ষিক মঞ্চে কাজ করছে; মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গেও তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিকসের সভাপতিত্ব ভারতকে এই বহুমুখী কূটনীতিকে একই মঞ্চে প্রদর্শনের সুযোগ দিয়েছে।
ভারতের জন্য এটি নিছক একটি সম্মেলন আয়োজনের সাফল্য নয়। এটি তার strategic autonomy-রও প্রদর্শন। দিল্লি যেন বলতে চেয়েছে—বিশ্ব রাজনীতিতে তাকে কোনো একটি শিবিরে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেওয়ার সময় এখন শেষ। ভারত পশ্চিমের সঙ্গে কাজ করবে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, আবার প্রয়োজনমতো চীনের সঙ্গেই বহুপাক্ষিক সহযোগিতায় থাকবে। আজকের বিশ্বে বড় শক্তি হওয়ার অর্থ শুধু শক্তিশালী অর্থনীতি বা সামরিক ক্ষমতা নয়; বরং পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক পরিচালনা করার ক্ষমতাও।
চীনের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের প্রভাব এখনো অস্বীকার করার মতো নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ, বিনিয়োগ এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে মার্কিন আর্থিক কাঠামোর প্রভাব গভীর। ফলে ব্রিকসের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করার আলোচনা চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নয়াদিল্লি ঘোষণায় দ্রুত, সস্তা ও কার্যকর আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে এই জায়গাতেই রাজনৈতিক প্রচার আর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার। ব্রিকস কোনো অভিন্ন মুদ্রা চালু করেনি, ডলারের বিকল্প কোনো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থাও তৈরি হয়নি। ডলারও তার অবস্থান হারায়নি। বরং যা ঘটছে তা হলো—ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক বহুপাক্ষিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি বিপ্লব নয়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবণতা।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ব্রিকসের গুরুত্ব আরও রাজনৈতিক। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। সেই সংকুচিত পরিসরের মধ্যে ব্রিকস তাকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার সুযোগ দেয়। এটি রাশিয়াকে কোনো সামরিক জোটের নিরাপত্তা দেয় না, পশ্চিমের বিরুদ্ধে কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক সমর্থনও নিশ্চিত করে না; কিন্তু কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে একটি বড় জানালা খুলে রাখে। রাশিয়ার জন্য সেই জানালাটির মূল্য যথেষ্ট।
ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের একই কাঠামোর মধ্যে উপস্থিতি ব্রিকসের চরিত্রটিকেই আরও স্পষ্ট করে। একদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরান, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত UAE—দুই ভিন্ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা একই টেবিলে বসেছে। ব্রিকসের শক্তি এখানেই যে, এটি এক ধরনের অভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠন নয়; বরং ভিন্ন স্বার্থের রাষ্ট্রগুলো যেখানে নিজেদের স্বার্থের মিল খুঁজে পায়, সেখানে সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে।
অবশ্য এই বৈচিত্র্যই ব্রিকসের সীমাবদ্ধতাও। সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান যত ভিন্ন হবে, একটি অভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তত কঠিন হবে। কেউ পশ্চিমবিরোধী অবস্থানে বেশি দৃঢ়, কেউ পশ্চিমের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত; কেউ রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ, কেউ চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়; কেউ আবার নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থকে সবার আগে রাখে। ফলে ব্রিকসকে ন্যাটোর মতো একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক বা সামরিক জোট হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।
বরং ব্রিকসের আসল শক্তি অন্যত্র—এটি Global South-এর অসন্তোষকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠ দিচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয়েছিল, তখনকার অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বাস্তবতা আজকের পৃথিবীর সঙ্গে এক নয়। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ থেকে IMF ও বিশ্বব্যাংক—অনেক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো এখনো পুরোনো ক্ষমতার ভারসাম্যের ছাপ বহন করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলছে, তাদের অর্থনৈতিক ও জনমিতিক গুরুত্বের তুলনায় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রতিনিধিত্ব কম। ব্রিকস সেই দাবিকে এখন একটি বড় বহুপাক্ষিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে।
এই কারণে ব্রিকসের উত্থানকে সরাসরি “পশ্চিমবিরোধী জোটের উত্থান” বলা যেমন ভুল, তেমনি একে নিছক আনুষ্ঠানিক আলোচনার ক্লাব বলাও ভুল। বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি উপসর্গ। বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য বদলেছে; সেই পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো কতটা বদলাবে—ব্রিকস মূলত সেই প্রশ্নটিই সামনে আনছে।
এখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লির সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে কেউ কূটনৈতিক দূরত্ব হিসেবে দেখবেন, কেউ নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে, আবার কেউ দেখবেন একটি সুযোগ হারানো হিসেবে। বাস্তবতা সম্ভবত এত সরল নয়।
বাংলাদেশ গেলে কী পেত? প্রথমত, ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি সুযোগ। দ্বিতীয়ত, চীন, রাশিয়া, UAE, ইরানসহ BRICS-এর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একই মঞ্চে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে যোগাযোগের সুযোগ। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ BRICS কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে এগোতে পারে, তা নিয়ে সরাসরি কূটনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ।
কিন্তু না যাওয়ার অর্থও এই নয় যে বাংলাদেশ কোনো নিশ্চিত অর্থনৈতিক সুবিধা হারিয়েছে। কোনো সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেই বিনিয়োগ আসে না, বাণিজ্য বাড়ে না, ঋণ পাওয়া যায় না কিংবা কূটনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না। এসবের জন্য আলাদা নীতি, দর-কষাকষি ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক দরকার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই ক্ষতির ভাষাটি “অর্থনৈতিক ক্ষতি”র চেয়ে “কূটনৈতিক সুযোগের ক্ষতি” বলাই বেশি যথার্থ।
আর এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় উপস্থিতি নিজেই একটি সম্পদ। বড় শক্তিগুলো যেখানে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর শক্তি হলো—তারা একাধিক শক্তির সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক রাখতে পারে। বাংলাদেশ যদি এই নীতিকে আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে BRICS, G20, জাতিসংঘ, BIMSTEC, ASEAN-সংলগ্ন কাঠামো কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম—সবগুলোই তার জন্য আলাদা দরজা হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গটিও এই আলোচনাকে আরও জটিল করে। BRICS যতই বহুপাক্ষিকতা ও অন্তর্ভুক্তির কথা বলুক, সদস্যপদের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ থেকে মুক্ত নয়। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বাস্তবতা এখানে BRICS-এর সীমা স্পষ্ট করে দেয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের রাজনীতিকে অতিক্রম করে না; বরং অনেক সময় রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিই প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করে।
এই কারণেই এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক চুক্তি নয়। সাফল্য হলো—এত ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণায় পৌঁছাতে পেরেছে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কয়েকটি ক্ষেত্রকে সামনে এনেছে। আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও এখানেই—ঘোষণার ভাষা ও বাস্তবায়নের ক্ষমতার মধ্যে এখনো যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে।
ব্রিকসের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো কথাকে প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের আলোচনা বাস্তবে কতদূর যায়, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, New Development Bank কতটা শক্তিশালী উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কতটা বাড়ে—এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে ব্রিকসের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারণ করবে।
কারণ সম্মেলন করা সহজ; প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কঠিন। ঘোষণাপত্র লেখা সহজ; অর্থনৈতিক আচরণ বদলানো কঠিন। রাষ্ট্রপ্রধানদের একই মঞ্চে হাসিমুখে দাঁড় করানো সম্ভব; কিন্তু তাদের পরস্পরবিরোধী স্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদে একই কাঠামোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতায় রূপ দেওয়াই আসল পরীক্ষা।
নয়াদিল্লির সম্মেলন তাই কোনো পক্ষের পরাজয়ের গল্প নয়। ভারত তার কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছে, চীন তার বিকল্পমুখী অর্থনৈতিক ধারণার জন্য আরও একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে, রাশিয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিসর ধরে রেখেছে, ইরান তার বিচ্ছিন্নতা কমানোর সুযোগ পেয়েছে, আর ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা Global South-এর রাজনৈতিক কণ্ঠকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার সুযোগ পেয়েছে। ছোট ও মাঝারি সদস্যদের লাভ হলো—বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে একই টেবিলে বসার সুযোগ।
অন্যদিকে যারা উপস্থিত ছিল না, তাদের সবাইকে পরাজিত বলা যাবে না। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি মূল্যবান সম্পদ—সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ—তারা কিছুটা হারিয়েছে। আর এই ক্ষতি অর্থের অঙ্কে মাপা যায় না।
সবশেষে, BRICS-এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই যে, এটি এখনো কোনো নতুন বিশ্বব্যবস্থা নয়, কিন্তু পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার প্রশ্নহীন স্থায়িত্বের ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
ডলার এখনো শক্তিশালী। পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এখনো অপরিবর্তিত। ব্রিকস এখনো অভিন্ন মুদ্রা চালু করতে পারেনি, কোনো ঐক্যবদ্ধ সামরিক শক্তিও নয়। ফলে “ব্রিকস বিশ্ব দখল করে ফেলেছে”—এমন উচ্ছ্বাস যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি “ব্রিকস শুধু কথার সংগঠন”—এমন অবজ্ঞাও দূরদর্শী নয়।
নয়াদিল্লিতে যে দৃশ্যটি আমরা দেখেছি, তার রাজনৈতিক অর্থ তাই ছবির চেয়ে গভীর। এক টেবিলে বসা রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের বন্ধু হয়ে যায়নি; কিন্তু তারা বুঝেছে, একে অপরকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের পৃথিবীও তৈরি করা যাবে না।
সম্ভবত এটাই নতুন বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
উষ্ণ আলিঙ্গন তাই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হবে সেই আলিঙ্গনের পর কে কতটা নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারল, কে কতটা নতুন দরজা খুলতে পারল এবং কে কতটা কথাকে বাস্তবে পরিণত করতে পারল।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের মঞ্চে করমর্দন হয়েছে।
এখন শুরু হবে আসল হিসাব।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net