January 23, 2026, 6:50 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ মোড়ের ব্যস্ত সড়ক। প্রতিদিনের মতোই ভোরের অন্ধকারে কর্মব্যস্ত পেট্রল পাম্প। কিন্তু ১৬ জানুয়ারি ভোর সাড়ে চারটার সেই মুহূর্তটি বদলে দিয়েছে একটি পরিবারের পুরো জীবন। মাত্র পাঁচ হাজার টাকার তেল—আর তার বিনিময়ে প্রাণ হারাতে হলো পেট্রল পাম্প শ্রমিক রিপন সাহাকে (৩০)।
রিপনের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়—পরিবার ও সহকর্মীদের দাবি, এটি ছিল নির্মম হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সেই রক্তাক্ত ঘটনার খবর খুব কম গণমাধ্যমেই গুরুত্ব পায়। অথচ এই মৃত্যুর সঙ্গে চাপা পড়ে গেছে একটি অসহায় পরিবারের কান্না, এক মায়ের বুকফাটা আহাজারি, আর ভবিষ্যৎহীন হয়ে পড়া কয়েকটি জীবনের গল্প।
নিহত রিপন সাহা রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর সাহাপাড়া এলাকার পবিত্র সাহার ছেলে। চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়—এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা, সংসারের খরচ, ওষুধপত্র—সবকিছুর ভার ছিল তার কাঁধে। গোয়ালন্দ মোড়ের করিম ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহকারীর কাজ করে যে আয় হতো, তা দিয়েই চলত পুরো সংসার।
কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়েই প্রাণ গেল তার।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে একটি কালো রঙের জিপগাড়ি করিম ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসে। গাড়ি থেকে নেমে আসেন রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও ঠিকাদার আবুল হাসেম সুজন। রিপন সাহা গাড়িতে পাঁচ হাজার টাকার তেল সরবরাহ করেন। কিন্তু টাকা পরিশোধ না করেই গাড়িটি দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করে।
নিজের শ্রমের ন্যায্য পাওনা নিতে রিপন দৌড়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ান। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ই তাকে গাড়ির নিচে ফেলে নির্মমভাবে চাপা দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর পাম্পের সামনের সড়কে মুখ ও মাথা থেতলানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় রিপনের নিথর দেহ।
ঘটনার পরই পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা মা এখন বাকরুদ্ধ। সন্তানের মরদেহের পাশে বসে শুধু একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—“আমার ছেলের অপরাধ কী ছিল?”
নিহতের ছোট ভাই প্রদীপ সাহা ঘটনার রাতেই রাজবাড়ী সদর থানায় হত্যা ও প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। মামলায় দুইজনকে আসামি করা হয়। প্রদীপ সাহা বলেন,
“সিসি টিভি ফুটেজে সব স্পষ্ট। কিভাবে গাড়িচাপা দিয়ে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে—পুলিশসহ সবাই দেখেছে। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ঘটনার পর পেট্রল পাম্পের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম সুজনকে রামকান্তপুর এলাকা থেকে এবং গাড়িচালক কামাল হোসেনকে বানিবহ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।
রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার জিয়াউর রহমান জানান,
“এ ঘটনায় দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন শ্রমিকের জীবন কি মাত্র পাঁচ হাজার টাকারও কম মূল্যবান? কেন এমন মৃত্যুর খবর গুরুত্ব পায় না? কেন শ্রমিকের রক্তে ভেজা সড়ক এত সহজেই সংবাদ তালিকা থেকে হারিয়ে যায়?
রিপন সাহা আর ফিরবেন না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন আরেকটি অবহেলিত খবর হয়ে না থাকে—এই দাবিই আজ পরিবার ও সচেতন মানুষের।