April 15, 2026, 1:16 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
বর্ণাঢ্য আয়োজনে কুষ্টিয়া সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের বর্ষবরণ উৎসব আধ্যাত্মিক সাধক হত্যা: দ্রুত বিচার দাবিতে দৌলতপুরে ভক্তদের বিক্ষোভ ও মানববন্ধন ব্রীজ হয়েছে, এবার রাস্তা দরকার –আশার আলো দেখছেন এলাকাবাসী কুষ্টিয়ায় আধ্যাত্মিক গুরু হত্যা/জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি প্রধান আসামি; ইসলামী সংগঠনের একাধিক নেতার নাম শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ ঐতিহ্যে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের নববর্ষ উদযাপন রমনা বটমূলে বৈশাখী বোমা হামলা: ২৫ বছর পরও বিচার যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা শিক্ষামন্ত্রীর পাশেই বসে ‘চেয়ার’ হারানোর খবর: যবিপ্রবি উপাচার্যের হাসি-চাপা বিষাদ খুলনা বিভাগের ১০ জেলার কেন্দ্রসচিবদেরকে শিক্ষামন্ত্রী/ শুধু মন্ত্রী বদলালেই শিক্ষার মান বাড়বে না আনন্দে বরণ নতুন বছর—আজ পহেলা বৈশাখ কুষ্টিয়ায় আধ্যাত্মিক সাধক হত্যার ঘটনায় মামলা, আসামি ২০০ জন

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ১২৭তম জন্মদিন আজ

ড. আমানুর আমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস/
আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬—বাংলার অমর কবি জীবনানন্দ দাশ-এর ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর উপাধি হলো তিনি রূপসী বাংলার কবি ; আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তার কবিতার সৌন্দর্য হলো বাংলার গ্রামীণ জীবন, ঋতুর পরিবর্তন, মৃত্যু-জীবনের দ্বন্দ্ব, প্রেমের নিভৃত আকাঙ্ক্ষা— সবই পরাবাস্তবতা আর বাস্তবতায় অদ্ভুতভাবে মিশে যাওয়া; যেখানে সবকিছু যেন এক অপার্থিব আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
বাংলার প্রকৃতি, নিঃসঙ্গ মানবচেতনা, সময়ের গভীর অনিশ্চয়তা ও স্মৃতির আবেশ—এসবকে অনন্য কাব্যভাষায় ধারণ করে তিনি বাংলা কবিতায় নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র এক নন্দনভুবন। সেই কারণেই তিনি পেয়েছেন “রূপসী বাংলার কবি” হিসেবে স্থায়ী স্বীকৃতি।
১৮৯৯ সালের এই দিনে বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
শিক্ষিত বৈদ্য পরিবারে জন্ম নেওয়া জীবনানন্দের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বরিশালের বগুড়া রোডের পারিবারিক বাড়িতে। তার বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও সমাজমনস্ক চিন্তাবিদ, আর মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি—মায়ের সাহিত্যচর্চাই তার সৃজনীজীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা। কর্মজীবনে তিনিও ব্রজমোহন কলেজে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বরিশালের নদী, শস্যক্ষেত, কুয়াশা ও গ্রামীণ নিসর্গ তার কাব্যজগতের গভীরতম প্রেরণাসূত্র হয়ে ওঠে।
জীবনানন্দের কাব্যভুবন বিস্তৃত, গভীর ও বহুমাত্রিক। প্রায় ৮০০ কবিতা রচনা করলেও জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র ২৬২টি। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বনলতা সেন, ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, রূপসী বাংলা এবং বেলা অবেলা কালবেলা। গদ্যগ্রন্থ কবিতার কথা ছাড়াও মৃত্যুর পর প্রকাশিত উপন্যাস মাল্যবান ও সতীর্থ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।
১৯৫২ সালে ‘সিগনেট সংস্করণ’ বনলতা সেন বাংলা ১৩৫৯ সালের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থের জন্য তিনি লাভ করেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার—যা তার সাহিত্যিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে।
বিশ্লেষক, গবেষকরা দেখিয়েছেন, জীবনান্দের কবিতার ভাষা, চিত্রকল্প ও সময়দর্শন বাংলা সাহিত্যে নতুন এক আধুনিকতার দিগন্ত উন্মোচন করে—যা শুধু রূপকল্প বা ভাষার স্তরে নয়, সময়ের গভীর দর্শন, অস্তিত্বের জটিলতা ও মানুষের অবচেতনের অন্ধকারে প্রবেশ করে। তাঁর কবিতায় ভাষা আর চিত্রকল্প যেন এক অদ্ভুত সংযোগে মিলে যায়: একদিকে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির ঘ্রাণময়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ (যেমন ধানের শীষ, হেমন্তের শিশির, শঙ্খচিলের উড়ান), অন্যদিকে নগরজীবনের ক্লান্তি, নৈরাজ্য, অবক্ষয় ও মৃত্যুচেতনার বিবমিষা-মিশ্রিত ছবি।
তাঁর ভাষা প্রমিত বাংলার বাঁধন ছেড়ে গদ্যের শ্লথতা, সাধু-চলিতের মিশ্রণ, এমনকি অপ্রত্যাশিত শব্দের জবরদস্তি নিয়ে নতুন এক ছন্দ সৃষ্টি করে। চিত্রকল্পে তিনি শুধু দৃশ্যমান নয়—ঘ্রাণপ্রধান, শ্রবণপ্রধান, স্বাদপ্রধান, এমনকি বিবমিষাপ্রধান উপাদান টেনে আনেন। উদাহরণস্বরূপ, “হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল” বা “সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত পৃথিবীতে শত শত শূকরীর প্রসববেদনা”—এসব চিত্র একইসঙ্গে নাগরিক অপরিচ্ছন্নতা, জীবনের ক্লেদাক্ততা ও অস্তিত্বের যন্ত্রণাকে ধরে। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর কবিতাকে “চিত্ররূপময়” বলে প্রশংসা করেছিলেন, আর বুদ্ধদেব বসু লক্ষ করেছেন তাঁর কবিতা “সবচেয়ে কম আধ্যাত্মিক, সবচেয়ে বেশি শারীরিক; সবচেয়ে কম বুদ্ধিগত, সবচেয়ে বেশি ইন্দ্রিয়নির্ভর”।
সময়দর্শনের ক্ষেত্রে জীবনানন্দ অসাধারণ। সময় তাঁর কাছে শুধু রৈখিক প্রবাহ নয়—এক অমোঘ সাক্ষী, এক অস্তিত্বের পর্যবেক্ষক, যা অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সীমানা ভেঙে অবচেতনের গভীরে প্রবেশ করে। তাঁর কবিতায় সময় প্রায়শই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়, যেমন “আবার আসিব ফিরে” ধারণায় চিরকালীনতা ও পুনরাবৃত্তির দ্বন্দ্ব। গবেষকরা দেখিয়েছেন, তাঁর কবিতায় সময়কে প্রায় দেবতুল্য মনে করা হয়—এক অ-ধর্মীয় দেবতা, যার সামনে মানুষ তার কর্মের সাক্ষ্য দিতে বাধ্য। এই সময়চেতনা পরাবাস্তবতার (সুররিয়ালিজম) সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে যুক্তি-বিধির বাইরে অবচেতনের স্বপ্নিল, অসংলগ্ন চিত্র উঠে আসে। জীবনানন্দই বাংলা কবিতায় প্রথম ব্যাপকভাবে এই পরাবাস্তব উপাদান প্রয়োগ করেন—যা পরবর্তীতে শামসুর রাহমান, মান্নান সৈয়দদের প্রভাবিত করে।
এই তিনটি উপাদান—ভাষা, চিত্রকল্প ও সময়দর্শন—মিলে জীবনানন্দ বাংলা কবিতাকে রবীন্দ্রোত্তর যুগে এক নতুন মাত্রা দেন: যেখানে প্রকৃতি ও নগরের দ্বন্দ্ব, জীবন-মৃত্যুর অমোঘ টান, নির্জনতা ও অস্তিত্বের শূন্যতা এক অপার্থিব সৌন্দর্যে মিশে যায়। তাই গবেষকরা তাঁকে “শেষ রোমান্টিক, প্রথম আধুনিক” বলেন—যিনি বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে না ছেড়ে, তাকে নতুন করে জন্ম দেন।
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন কবি। পরে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জন্মদিনে তাঁর প্রতি রেইল সশ্রদ্ধ ভালবাসা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net