August 9, 2026, 12:54 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলােইন/
রাজশাহী অঞ্চলে আমন ধানের চারা রোপণে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামাঞ্চলের মাঠে শুরু হচ্ছে কৃষকের কর্মযজ্ঞ। কেউ কাঁধে করে ধানের চারা নিয়ে যাচ্ছেন জমিতে, কেউ ট্রাক্টর দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন। কোথাও আবার নারী-পুরুষ একসঙ্গে কোমরপানিতে নেমে সারিবদ্ধভাবে আমনের চারা রোপণ করছেন।
তবে আমন রোপণের এই ব্যস্ততার মধ্যেই কৃষকদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সার। সরকারি বরাদ্দ বাড়লেও অনেক কৃষক অনুমোদিত ডিলারের কাছে নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তাদের একই সার কিনতে হচ্ছে খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে।
রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রাম ও বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অনুমোদিত ডিলারের দোকানে ভর্তুকি মূল্যের সার নেই। অথচ আশপাশের খুচরা দোকানে একই ধরনের সার মিলছে, তবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে।
সরকার নির্ধারিত দামে ৫০ কেজির এক বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ১ হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, অনুমোদিত ডিলারের কাছে সার না পেয়ে তাদের টিএসপি কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ডিএপি প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায়।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের দোকান খোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই মজুত শেষ হয়ে গেছে বলে জানানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে সার না পেলেও বেশি দাম দিতে রাজি হলে অন্য দোকানে সার পাওয়া যাচ্ছে। আবার খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনলে অনেক সময় ক্যাশ মেমোও দেওয়া হচ্ছে না।
পবা উপজেলার বড়াইকুড়ি গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেনের কৃষি কার্ড রয়েছে। তিনি বলেন, কয়েকবার অনুমোদিত ডিলারের কাছে গিয়েও সার কিনতে পারেননি। সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশি দাম দিতে রাজি থাকলে সার পাওয়া যায়।
নওহাটা বাজারের বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে গিয়ে ভর্তুকির সার পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ডিলার আব্দুল হক বলেন, ৪২টি মৌজার কয়েক হাজার কৃষককে তাদের মাধ্যমে সার সরবরাহ করতে হয়। জুলাই মাসে তিনি মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) এবং ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছেন। দুই-তিন দিনের মধ্যেই এসব সার শেষ হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন আরেক অনুমোদিত ডিলার তাসনিম এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী জানান, তাদের মজুত শেষ হয়ে গেছে। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফজলুর রহমান দাবি করেন, তাদের দোকানে সার ছিল।
অনুমোদিত ডিলারের পাশের একটি খুচরা দোকানে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপির দাম চাওয়া হয় ১ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ সরকারি দামের চেয়ে ৫৫০ টাকা বেশি। ওই খুচরা বিক্রেতা জানান, তারা বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহ করেন। তার দাবি, ভর্তুকির সার কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর হাত ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়।
এদিকে সরকারি তথ্য বলছে, চলতি আমন মৌসুমে সার বরাদ্দ কমেনি; বরং রাজশাহী অঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তা বেড়েছে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে এবার আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার হেক্টর। শনিবার (৮ আগস্ট) পর্যন্ত এর প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে ইউরিয়া ছাড়া তিনটি প্রধান সারের বরাদ্দ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির সম্মিলিত বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮৭৬ টন। চলতি জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৩৩ টন।
আগস্টেও বরাদ্দ বেড়েছে। টিএসপি ১ হাজার ৪৩০ টন থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫১১ টন, ডিএপি ২ হাজার ৪০৪ টন থেকে ২ হাজার ৬৪৭ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৭০৯ টন থেকে ১ হাজার ৭৬০ টনে উন্নীত হয়েছে। নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বরাদ্দ বেড়েছে। তবে নাটোরে সামান্য কমেছে।
বরাদ্দ বাড়ার পরও মাঠপর্যায়ে কেন কৃষক নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিএডিসি রাজশাহী শাখার সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিন বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পরিমাণ অনুযায়ীই বিএডিসি সার বিতরণ করে। বরাদ্দের বাইরে তাদের অতিরিক্ত সার সরবরাহের সুযোগ নেই। কিছু কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি সার প্রয়োগ করায় মৌসুমে চাহিদা বেড়ে থাকতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, সারের ঘাটতি নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। বর্তমানে সব জায়গায় আমন রোপণ চলছে এবং কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। এবারও আমনের ভালো ফলন হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তবে কৃষকদের সরাসরি অভিযোগ এবং বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির তথ্যের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের এই পার্থক্য মাঠপর্যায়ে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জেলা সার বিতরণ কমিটির প্রধান ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সারের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ কোনো কৃষক তাকে করেননি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।