February 23, 2026, 12:48 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া প্রতিবেদন/সূত্র, দৈনিক কালের কন্ঠ
দেশের শীর্ষ বাংলা দৈনিক কালে কন্ঠ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের একটি সাক্ষতকার প্রকাশ করেছে। যেখানে তিনি তার দেড়বছরের বঙ্গভবন নিয়ে অনেক কথা তুলে ধরেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার টানা দেড় বছরের অভিজ্ঞতা—যা তাঁর ভাষায় ছিল অস্বস্তি, চাপ ও বিচ্ছিন্নতার এক দীর্ঘ অধ্যায়। রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সাড়া ফেলেছে। তবে সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত অধিকাংশ অভিযোগই রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নভিত্তিক; সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
সাক্ষাতকারে উঠে এসেছে অনেক সূক্ষ্ম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত। বিশেষ করে তার অপসারণ সংক্রান্ত টানাপোড়েনে তিনি বিএনপির সমর্থনের কথা বলেছেন, কিন্তু “অন্য একটি গ্রুপ”-এর কথা উল্লেখ করলেও তাদের নাম বলেননি।
রাষ্ট্রপতি দেড় বছরের সময়টিকে আখ্যা দিয়েছেন “বিভীষিকাময়” হিসেবে। তাঁর দাবি, একাধিকবার অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তাঁকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তিনি অনড় ছিলেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্নে। তাঁর উচ্চারণ—“রক্ত ঝরে ঝরুক, আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব”—শুধু আবেগঘন নয়, বরং নিজেকে এক প্রহরীর ভূমিকায় তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবরের বঙ্গভবন ঘেরাও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেদিনের পরিস্থিতি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ—সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর রাত। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রণ হারালে “গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুটের শিকার হতে পারত।”
তবে এই ঘটনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, দুঃসময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোটসঙ্গীরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাঁর ভাষ্যে, কিছু রাজনৈতিক শক্তি অপসারণের উদ্যোগ নিলেও বিএনপি সেই প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেয়নি, ফলে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
রাষ্ট্রপতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সমন্বয় বজায় রাখেননি। তিনি দাবি করেন, বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার প্রচলিত বিধান অনুসরণ করা হয়নি। ১৪–১৫টি বিদেশ সফরের পরও তাঁকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়েও তিনি অবগত ছিলেন না বলে জানান। আরও বলেন, কসোভো ও কাতারে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তাঁর সফর আটকে দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি খসড়া চিঠিতে “রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ততা” উল্লেখ করে সফরে না যাওয়ার ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল—যার জবাবে তিনি প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে পাল্টা চিঠি পাঠান বলে দাবি করেন।
এই অভিযোগগুলো রাষ্ট্রীয় সমন্বয় কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যাখ্যা ছাড়া পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্যমতে, বিদেশে বাংলাদেশ হাইকমিশনগুলো থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল—যা তিনি অপসারণের প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। বঙ্গভবনের প্রেস উইং প্রত্যাহার এবং জাতীয় দিবসে তাঁর বাণী প্রচার বন্ধ থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ধরনের ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও তা গভীর তাৎপর্য বহন করে। আবার, এসব পদক্ষেপের পেছনে প্রশাসনিক ব্যাখ্যাও থাকতে পারে—যা এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়নি।
বিশ্লেষণ: ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের দলিল?
রাষ্ট্রপতির এই সাক্ষাৎকার কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—
১. সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন
যদি অপসারণের উদ্যোগের দাবি সত্য হয়, তবে তা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা নির্দেশ করে। আবার, রাজনৈতিক আলোচনায় এমন প্রস্তাব ওঠা মানেই তা সাংবিধানিক সংকটে রূপ নিয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও তাড়াহুড়া হতে পারে।
২. ক্ষমতার ভারসাম্য ও যোগাযোগের ঘাটতি
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়। সংবিধানে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা উপেক্ষিত হলে তা প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক আস্থায় প্রভাব ফেলে।
৩. নিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিতর্ক
বিএনপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং একটি অজ্ঞাত গোষ্ঠীর সমালোচনা রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে বিতর্ক উসকে দিতে পারে। বাস্তব রাজনীতির জটিলতায় নিরপেক্ষতার আদর্শ কতটা রক্ষা করা যায়—এই প্রশ্নও সামনে আসে।
৪. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত
রাষ্ট্রপতি দাবি করেছেন, কূটনৈতিক মহলও তাঁর অপসারণের বিপক্ষে ছিল। বিষয়টি যদি যাচাইযোগ্য হয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বলে ধারণা করা যায়।
দেয়ালের আড়ালের গল্প, জনমতের আয়নায়/
বঙ্গভবনের অন্তরালে উচ্চারিত এই সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি রাষ্ট্রপ্রধানের নিজের ভাষ্যে এক অস্থির সময়ের বর্ণনা। তবে এটি আপাতত একপাক্ষিক দলিল—যেখানে অন্য পক্ষের বক্তব্য অনুপস্থিত।
গণতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থা, সমন্বয় ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য যদি বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের গভীর টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়।