February 24, 2026, 1:04 am

দৈনিক কুষ্টিয় অনলাইন/
কুষ্টিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আমির হামজা–র বিরুদ্ধে রমজান মাসে ‘মরাল পুলিশিং’-(নৈতিকতা-জবরদস্তি) এর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
কী ঘটেছে?
গত শনিবার কুষ্টিয়া সদরের পাটিকাবাড়ি বাজারে ঘটনাটি ঘটে। ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাজার পরিদর্শনে যান এমপি আমির হামজা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাটিকাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মসিউল আজম।
একটি চায়ের দোকানে গিয়ে নামাজের সময় টিভি চালানো ও ক্যারাম খেলা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। ভিডিওতে শোনা যায়, পুলিশ কর্মকর্তা ধমকের সুরে বলেন—রমজান মাসে কোনো ক্যারাম বা টিভি চলবে না।
এ সময় এমপি আমির হামজাকেও দোকানিদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, রমজান মাস ‘এবাদতের মাস’, তাই অন্তত নামাজের সময় এসব কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর
ভিডিওটি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে এটিকে ‘মরাল পুলিশিং’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ঘটনার পর পুলিশ কর্মকর্তা মসিউল আজমকে পাটিকাবাড়ি ক্যাম্প থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন জানান, এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমপির উপস্থিতিতে তার বক্তব্যই পুলিশ কর্মকর্তা উচ্চারণ করেছেন, যা একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে করা উচিত হয়নি।
এমপি আমির হামজা যা বলছেন
আমির হামজা বলেন, তিনি মরাল পুলিশিং করতে যাননি। তার দাবি, ‘দ্বীনের দায়’ থেকে রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় দোকানিদের অনুরোধ করেছিলেন।
তার ভাষায়, “আমরা শুধু বলেছি, রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষার্থে অন্তত এই একমাস এসব বন্ধ রাখবেন। এর বাইরে কিছু বলিনি।”
তিনি আরও বলেন, তার কথাই পুলিশ কর্মকর্তা কিছুটা উচ্চস্বরে পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি ঐ পুলিশ অফিসারকে কি বলতে হবে এ ধরনের কোন ডিক্টেট করেননি।
তিনি বলেন, লোকে তাকে ভোট দিয়েছেন। তারাই তার কাছে বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ে কিঝু করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি সেখান থেকেই তাগিদ অনুভব করেছেন। তিনি বলেন, গ্রামের ছোট ছেট ছেলেরা সারাদিন পড়াশোনা বাদ দিয়ে যেসব দোকানে টিভি আছে, ক্যারাম আছে সেখানে গিয়ে বসে থাকছে। তিনি প্রশ্ন করেন এদের লেখা পড়ার টেবিলে ফেরানোর দায়িত্ব কে নেবে ?
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় কয়েকজন দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমপি ও পুলিশের সতর্কবার্তার পর বাজারের বেশিরভাগ দোকানে টিভি ও ক্যারাম খেলা বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে তাদের বেচাকেনা কমে গেছে বলেও দাবি করেন তারা।
তাদের মতে, তারা এমনভাবে টিভি চালাতেন বা খেলাধুলা করতেন যাতে মুসল্লিদের নামাজে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। এ বিষয়ে আগে কোনো অভিযোগও ওঠেনি।
আইন কী বলছে?
আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধান কাউকে ‘মরাল পুলিশিং’-এর অধিকার দেয় না। কেউ যদি আইন ভঙ্গ না করেন, তাহলে তার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যায় না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রমজানে দিনের বেলায় দোকান খোলা রাখা বা টিভি চালানো নিষিদ্ধ—এমন কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই। তবে কারও ধর্মীয় অনুশীলনে বাধা সৃষ্টি হলে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু পূর্বঘোষণা ছাড়াই এভাবে ধমক দেওয়া আইনসম্মত নয়।
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এমন ঘটনায় জড়ানো দুঃখজনক এবং এটি সংবিধানসম্মত নয়।
তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজন হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রমজান মাসে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ঘিরে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। তবে কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
এদকে অনেক সাধারণ মানুষ শহর থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত দোকানে দোকানে সারাদিন টিভি চালিয়ে ক্যরাম জুয়া খেলার বিপক্ষে কথা বলেছেন।
বিবিসি অবলম্বনে/