July 29, 2026, 2:26 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুকে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কুষ্টিয়া-২ আসনের বিরোধীদলীয় (জামায়াত) সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর। এ সময় তাঁর সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এটি আর নিছক একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে বিবেচিত হয়নি; বরং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। রাষ্ট্রের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স মূলত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিক প্রোটোকলে পদমর্যাদার ক্রম নির্ধারণ করে। সেখানে একজন সংসদ সদস্যের অবস্থান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ঊর্ধ্বে। কিন্তু এই পদমর্যাদার তালিকা কোনো জনপ্রতিনিধিকে সরকারি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ বা শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রে আইনগত বাধা সৃষ্টি করে না। ফলে ঘটনাটিকে কেবল ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স লঙ্ঘনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়।
আসল প্রশ্নটি প্রোটোকলের নয়; প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার স্থানীয় প্রতিনিধি। তাঁর অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। অন্যদিকে সংসদ সদস্য একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি, যিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ, দল ও নির্বাচনী ম্যান্ডেটের প্রতিনিধিত্ব করেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক সহযোগিতামূলক হলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় পৃথক। সেই পৃথকত্বের দৃশ্যমান প্রকাশও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
জনপ্রশাসনবিদ্যায় একটি বহুল স্বীকৃত ধারণা হলো—প্রশাসন শুধু নিরপেক্ষ হলেই যথেষ্ট নয়; জনগণের কাছেও তাকে নিরপেক্ষ বলে প্রতীয়মান হতে হবে। বিচারব্যবস্থার সুপরিচিত নীতির মতোই—”Justice must not only be done, but must also be seen to be done.” প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই দর্শন প্রযোজ্য। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে নাগরিকেরা সেই প্রতিষ্ঠানকে কতটা নিরপেক্ষ ও দলনিরপেক্ষ বলে মনে করেন।
এই কারণেই সরকারি কার্যালয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময়কে অনেকেই কেবল সৌজন্য হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি প্রশাসনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার একটি উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছেন। এখানে বাস্তব নিরপেক্ষতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিরপেক্ষতার জন-প্রতিচ্ছবি (public perception of neutrality)।
অবশ্য ঘটনাটির আরেকটি দিকও রয়েছে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক একটি কার্যকর স্থানীয় প্রশাসনের জন্য অপরিহার্য। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, আইন-শৃঙ্খলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা জনসেবা—সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের সমন্বয় প্রয়োজন। সে অর্থে নবনিযুক্ত একজন কর্মকর্তাকে শুভেচ্ছা জানানো গণতান্ত্রিক সৌজন্যের অংশ বলেই বিবেচিত হতে পারে।
তবে প্রশ্ন হলো, সৌজন্য প্রকাশের স্থান ও পদ্ধতি কি আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ হতে পারত না?
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. আমানুর আমানের মতে, সংসদ সদস্য চাইলে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন, কোনো নিরপেক্ষ জনপরিসর কিংবা উন্মুক্ত নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করতে পারতেন। সেখানে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে নবাগত ইউএনওকে স্বাগত জানানো হলে তা একদিকে যেমন সৌজন্যের মর্যাদা পেত, অন্যদিকে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েও কোনো প্রশ্নের অবকাশ সৃষ্টি হতো না।
প্রকৃতপক্ষে, একটি পরিণত গণতন্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু সম্পর্কের আন্তরিকতায় নয়, তার প্রকাশভঙ্গিতেও নিহিত। কারণ গণতন্ত্র ব্যক্তি-নির্ভর নয়; এটি প্রতিষ্ঠান-নির্ভর। আর প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় তখনই, যখন তার নিরপেক্ষতা শুধু বাস্তবে নয়, জনমানসেও প্রশ্নাতীত থাকে।
অতএব, মিরপুরের ঘটনাটি মূলত আইনগত বিরোধের নয়; এটি প্রশাসনিক নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য, দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের সৌজন্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত, যাতে রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা—উভয়ই সমানভাবে সংরক্ষিত থাকে।