January 13, 2026, 3:32 pm

শুভব্রত আমান, কুষ্টিয়া/
দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় ও লাভজনক রেলরুট বেনাপোল–খুলনা–মোংলা (বেতনা) কমিউটার ট্রেন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। রবিবার (১১ জানুয়ারি) থেকে ‘এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’ নামের একটি বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রেনটির টিকিট ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
রেলওয়ের দাবি—রাজস্ব বাড়ানোই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। লাভজনক এই ট্রেন বেসরকারি হাতে দেওয়ায় সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী ও নিত্যযাত্রীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। তাদের একটাই দাবি—এই ট্রেন সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই চলুক।
ভাড়া অপরিবর্তিত, সময়সূচিতে পরিবর্তন/
বেনাপোল রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানান, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলেও আপাতত ট্রেনের ভাড়া আগের মতোই থাকছে। তবে সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে প্রতি মঙ্গলবার ট্রেনটি বন্ধ থাকলেও এখন সপ্তাহের সাত দিনই চলবে।
রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিমালা অনুযায়ী তিন বছরের জন্য ট্রেনটি লিজ দেওয়া হয়েছে এবং চুক্তি ভঙ্গ হলে লিজ বাতিলের ক্ষমতাও রেলওয়ের হাতে থাকবে।
পাকশীতে কর্মরত রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মিহির কুমার গুহ বলেন,
“গত ছয় মাসের আয়ের চেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
যাত্রীদের প্রশ্ন—লাভ হলে বেসরকারি কেন?
তবে যাত্রীদের প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের দাবি, এই ট্রেনটি বর্তমানে মাসে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা আয় করছে। পর্যাপ্ত টিকিট চেকার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করলে সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব ছিল।
নিয়মিত যাত্রী সাইফুল ইসলাম সাঈদ বলেন,
“খুলনা থেকে বাসে বেনাপোল আসতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা, ভাড়া ২৫০ টাকা। অথচ এই কমিউটার ট্রেনে আড়াই ঘণ্টায় মাত্র ৪৫–৫০ টাকায় আসা যায়। এমন একটি জনবান্ধব ট্রেন বেসরকারি হাতে দেওয়া মানে সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করা।”
আরেক যাত্রী মাহমুদুল হাসান নাবিল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন,
“আগেও দেখেছি—বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে সেবার মান কমে যায়, চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। আবার সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে।”
অতীত অভিজ্ঞতা ফিরছে কি?/
এই রুটের ইতিহাস যাত্রীদের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়ার পর ২০১০ সাল পর্যন্ত ট্রেনটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ছিল। এরপর দুই দফায় বেসরকারি খাতে দেওয়ার পর সেবার মান অবনতি, অনিয়ম ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় ২০১৩ সালে ট্রেনটি আবার সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা হয়।
২০১৭ সালে রুটের গুরুত্ব বিবেচনায় দিনে দুইবার ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন থেকেই এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
গোপনে লিজ, জনমত উপেক্ষার অভিযোগ/
রেল সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল টিকিট ব্যবস্থাপনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৯ মে দরপত্র খোলা এবং জুনের প্রথম সপ্তাহে যাচাই-বাছাই শেষে রেলের মূল্যায়ন কমিটিতে পাঠানো হয়। পরে ‘এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’-কে তিন বছরের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের জনমত যাচাই ছাড়াই এবং আন্দোলন এড়াতে অনেকটা গোপনেই এই লিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
টেন্ডার পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মালিক হুমায়ন আহমেদ বলেন,
“আমরা নিয়ম মেনেই কাজ পেয়েছি। বাজেট ও প্রশাসনিক কারণে এতদিন দায়িত্ব নিতে দেরি হয়েছে। এখন থেকে বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনায় ট্রেন চলবে।”
লাভজনক হয়েও কেন একটি জনবান্ধব ট্রেন বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হলো—এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বেনাপোল থেকে মোংলা পর্যন্ত। বগি কমে যাওয়া, সেবার মান অবনতি এবং যাত্রী হয়রানির আশঙ্কায় রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ।