May 17, 2026, 10:38 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে সংকটের মুখে পড়েছে। কোথাও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কোথাও গ্রেপ্তার-হয়রানি, আবার কোথাও অনলাইন নজরদারি ও সহিংসতার কারণে সাংবাদিকদের পেশাগত পরিবেশ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে এশিয়ার বহু দেশে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার অনেক দেশ সংবিধানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্র দিন দিন সীমিত হচ্ছে। রাজনৈতিক, দুর্নীতি, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারবিষয়ক সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি সেন্সরশিপের বদলে আত্মসেন্সরশিপ, মামলা বা অনানুষ্ঠানিক চাপের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে এখন একটি ‘পরিবর্তনশীল অবস্থায় থাকা দেশ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা বা বড় ধরনের সহিংস ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। বর্তমান সরকারও প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদপত্র মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে অবস্থানের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয় সাংবাদিক সুরক্ষা আইন ও সাংবাদিক কল্যাণ বোর্ড গঠনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে।
তবে ইতিবাচক বার্তার পাশাপাশি উদ্বেগও পুরোপুরি দূর হয়নি। সাংবাদিকদের একটি অংশ মনে করছেন, এখনো আত্মসেন্সরশিপের প্রবণতা রয়েছে। রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়, ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিরোধ কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশে অনেকেই সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও আটক হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু সরাসরি দমননীতি নয়; বরং একটি স্বাধীন ও নিরাপদ পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করা। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে সাংবাদিকরা প্রায়ই সংগঠিত ট্রল, হুমকি ও সামাজিক চাপের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখনও ানেক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারে সামরিক শাসনের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। চীন ও ভিয়েতনামে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠোর। পাকিস্তান ও ভারতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণে সংবাদমাধ্যমের পরিসর আরও সংকুচিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদাহরণ দেখায়—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একবার সংকুচিত হতে শুরু করলে তা দ্রুতই গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনি সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম শুধু তথ্য প্রচারের মাধ্যম নয়; এটি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের অন্যতম ভিত্তি। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মানে শুধু সাংবাদিকদের সুরক্ষা নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশে পরিস্থিতির কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিললেও সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং সাংবাদিকরা কতটা স্বাধীন ও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন—সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।