February 6, 2026, 12:18 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের গুম, ভয়ভীতি ও দমন–পীড়নের পরিবেশ কিছুটা শিথিল হলেও নতুন করে গণগ্রেপ্তার, জামিন না দেওয়া এবং জনতার সহিংসতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে—এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ঘোষিত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত বহু মানুষকে নির্বিচারে আটকের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সহিংসতা, কট্টরতা ও জনতার বিচার/
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে সক্রিয় সহিংস গোষ্ঠীগুলো বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী অধিকারবিরোধী ও এলজিবিটিবিরোধী কট্টরপন্থী শক্তির উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন—যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতার ইঙ্গিত বহন করে।
গণগ্রেপ্তার, অজ্ঞাত আসামি ও হেফাজতে মৃত্যু/
এইচআরডব্লিউ বলছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আটক ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের যে সংস্কৃতি আগের সরকার আমলে ছিল, তা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বহু মামলায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে শত শত মানুষকে আসামি করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা–কর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহে কারাবন্দী, যাদের অনেকেই দীর্ঘদিন বিচার ছাড়াই আটক এবং নিয়মিতভাবে জামিন বঞ্চিত হচ্ছেন। তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীর নামও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছর শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আরও আটকের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এদিকে গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের পর ব্যাপক আটক ও হাজারো অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা দায়েরের ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও সরকার গণগ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন; তাদের মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত এবং ৮১ জন নিহত হয়েছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনি বিধিনিষেধ/
প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত ক্ষমতা ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ করায় দলটির সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন সমর্থনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর বহু হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগই রাজনৈতিক কর্মী বা সহিংস জনতার দ্বারা সংঘটিত। পাশাপাশি ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ অভিযোগে লেখক–সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি কার্যক্রম নেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ মনে করে, সাইবার নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা বাতিল হলেও এখনও এমন বিধান রয়েছে যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অতীতের লঙ্ঘনের বিচার ও সীমিত অগ্রগতি/
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিলেন; ওই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন।
তবে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত—এমন মন্তব্য করেছে এইচআরডব্লিউ। পুলিশের একজন মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে ভূমিকার জন্য মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার মান, স্বচ্ছতা, মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং রাজনৈতিক সংগঠন বিলুপ্তির ক্ষমতা নিয়েও মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা ও মানবিক চাপ/
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ায় অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, শ্রম ও নারী অধিকার খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে অগ্রগতি সীমিত।
‘জুলাই ঘোষণা’ ও ‘জুলাই সনদ’ প্রকাশ সত্ত্বেও সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন কম। একই সঙ্গে নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নতুন রোহিঙ্গা প্রবেশ এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।