February 19, 2026, 3:12 pm

ড. আমানুর আমান/, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত তৈরি হয় যা কেবল ক্ষমতার হস্তান্তরের মুহুর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এগুলো নতুনভাবে রচনা করে জনগণের আশা, শাসনের দর্শন এবং রাষ্ট্রচিন্তার মানচিত্র। এই মুহুর্তে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে, এমন একটি নির্ধারক মুহূর্ত কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান—সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের পর দেশীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন নতুন নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দেশে ফিরে তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাবশালী বক্তব্য—-আই হ্যাভ আ প্ল্যান—(I have a Plan) শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; বরং এটি শাসন ও প্রশাসনের পুনর্গঠনের একটি নির্দেশক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচনী সমাবেশে তিনি যে নীতি ও কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা উপস্থাপন করেন, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কার। নির্বাচনী ফলাফলে এই নীতিমালার প্রতি জনগণের বিশাল আস্থা প্রতিফলিত হয়, যা তাকে এককভাবে সরকার গঠনের দায়িত্ব প্রদান করে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, তিনি একাধিক সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রথাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাহ্যিক জৌলুস থেকে নিজেকে দূরে রেখে, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, গাড়িবহর সীমিতকরণ, অপ্রয়োজনীয় প্রোটোকল হ্রাস এবং মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপগুলো শুধুমাত্র প্রশাসনিক সরলীকরণ নয়—এগুলো ক্ষমতার নৈতিক সংযমের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো নাগরিকদের ভোগান্তি কমানো এবং রাষ্ট্রকে জনগণের আরও কাছাকাছি আনার প্রচেষ্টার প্রতিফলন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর নীতি দৃঢ় ও সংযত। তিনি কোনো আবেগ বা রাজনৈতিক চাপের প্রভাবে বিচ্যুত হন না; বরং সকল কর্মকাণ্ড নীতি, আইন এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। অন্যায়, নির্যাতন বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি আইনের শাসনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেছেন এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ন্যায় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃঢ় মনোভাব প্রদর্শন করেছেন।
একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় ভারসাম্যপূর্ণ ও সুচিন্তিত কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি কেবল অভ্যন্তরীণ ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি সচেতন নন, বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেও সমানভাবে দায়িত্বশীল। তাঁর সংযত ও দৃঢ় পদক্ষেপগুলো দেখায় যে, শাসনের ক্ষেত্রে নীতি ও যুক্তি কখনও বাহ্যিক প্রোটোকল বা ক্ষমতার প্রদর্শনীর চাপে ক্ষুণ্ন হবে না; বরং ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসনের আদর্শ সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে।
প্রশাসনের প্রতি তাঁর আহ্বান—-দলীয় পরিচয় ভুলে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কাজ করার—রাষ্ট্রযন্ত্রকে পেশাদার, নিরপেক্ষ ও নাগরিককেন্দ্রিক করার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। একই সঙ্গে তিনি সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্ট করেছেন: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এসব পদক্ষেপ বাস্তবমুখী প্রশাসন ও কার্যকর শাসনের প্রতীক।
রাজনৈতিক সহাবস্থানের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের পদক্ষেপও দৃষ্টিগ্রাহ্য। তিনি বিভিন্ন মতাদর্শের জাতীয় নেতাদের নিজ নিজ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেছেন, যা রাজনৈতিক সংলাপ ও সৌজন্য পুনর্জীবিত করার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতির মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান ও সমন্বয়ের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাসনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তারেক রহমানের উদ্যোগগুলো দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারা সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগিয়েছে। যদি এই নৈতিক সংযম, প্রশাসনিক সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনধারার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে এর প্রভাব একক সরকারের সাফল্যের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও পরিণত, স্বচ্ছ ও মানবিক করতে পারে।
অতএব, বর্তমান সময়কে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্লিখনের একটি সূচনালগ্ন হতে পারে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান—যিনি দীর্ঘ নির্বাসনের পর নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত অন্তর্দৃষ্টি এবং নৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন জনসাধারণের প্রত্যাশা, সংশয় এবং সম্ভাবনার জটিল সমীকরণ তৈরি করছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের শাসন ব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণ করছে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে, এই মুহূর্তকে দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রূপান্তরমূলক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং নাগরিক, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। তারেক রহমানের নেতৃত্ব এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে স্বচ্ছ, ন্যায়পরায়ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় দায়িত্ব, ন্যায় এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে।