May 18, 2026, 11:28 am

ড. আমানুর আমানের কলাম/
বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা, শিশু রোগীতে চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। তবে উদ্বেগের বিষয় শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একে শুধু “হামের প্রাদুর্ভাব” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার গভীরতা আড়াল হয়ে যাবে। কারণ এই সংকটের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় আশঙ্কা—দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা কিংবা প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া বিভিন্ন সংক্রামক রোগ আবারও ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একটি দেশে বড় আকারে হাম ছড়িয়ে পড়া সাধারণত একটি বিষয়ই নির্দেশ করে—সেই দেশের টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এটি শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়। ফলে শিশুর শরীর অন্যান্য সংক্রমণের প্রতি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এই কারণেই হামকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি “সতর্ক সংকেত” হিসেবে দেখা হয়।
গত দুই দশকে শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত সাফল্য অর্জন করেছিল। দীর্ঘমেয়াদি ইপিআই কর্মসূচি, গণটিকাদান এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় দেশ পোলিওমুক্ত স্বীকৃতি পেয়েছে, নবজাতকের ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস-বি ও রুবেলার সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে। একসময় যেসব সংক্রামক রোগ শিশু মৃত্যুর বড় কারণ ছিল, সেগুলোর বিস্তারও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন সতর্ক করছেন, সেই দীর্ঘদিনের অর্জনের ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, টিকার সরবরাহ সংকট, মাঠপর্যায়ের নজরদারির শিথিলতা এবং সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার ঘাটতি, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে শিথিলতা এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক অঞ্চলে শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে ঝুঁকির মধ্যে চলে গেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—হামের সঙ্গে অন্য রোগের সম্পর্ক কোথায়?
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, হাম শিশুদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ধ্বংস করে দেয়। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা সংক্রামক রোগগুলোও তখন সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে জলাতঙ্ক, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, যক্ষা ও কুষ্ঠের মতো রোগের পুনরুত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকারের প্রসঙ্গ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। কারণ বাংলাদেশ বহু বছর ধরে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। যদি টিকাদান ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা তৈরি হয়, তাহলে সেই অর্জনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—হাম থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুরাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারও দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কেউ অপুষ্টিতে ভুগতে পারে, আবার কারও মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ এই সংকটের প্রভাব শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে, কিন্তু অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত শয্যা, আইসিইউ বা জনবল নেই। গ্রামীণ অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছায়। ফলে জটিলতা বাড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তবে চলমান এই সংকট জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্বাস্থ্য খাতে সাময়িক সাফল্য অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই সাফল্য ধরে রাখতে প্রয়োজন ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু এককালীন টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদে জনগণকে নিরাপদ রাখা সম্ভব হয় না। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখা, মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি বজায় রাখা, জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা—এই সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করতে হয়। এর কোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা তাই শুধু জরুরি পদক্ষেপ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে:
প্রথমত: নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আবার শক্তিশালী করতে হবে। ১০০ শিশুর মধ্যে অন্তত ৯৫ জনকে টিকার আওতায় আনতে না পারলে “হার্ড ইমিউনিটি” তৈরি হয় না।
দ্বিতীয়ত: গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ জরুরি। তৃতীয়ত, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপুষ্ট শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। কোন অঞ্চলে টিকাদান কমেছে, কোথায় সংক্রমণ বেশি, কোন বয়সী শিশুরা ঝুঁকিতে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন।
সরকার ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের কথা বলছে। নতুন টিকা সরবরাহও শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না; মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, ভুল ধারণা এবং অবহেলার কারণেও টিকাদান ব্যাহত হয়।
সবশেষে বলা যায়, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে জনস্বাস্থ্য খাতে অর্জিত সাফল্য কখনো স্থায়ী নয়; তা ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, সচেতনতা এবং কার্যকর কর্মসূচি প্রয়োজন। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু অবহেলা চলতে থাকলে বাংলাদেশকে হয়তো আবার সেই পুরোনো সংক্রামক রোগগুলোর সঙ্গেই নতুন করে লড়াই করতে হবে।