May 29, 2026, 8:50 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ফিলিস্তিনি নারী ও বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। জাতিসংঘ সম্প্রতি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর জেরে ইসরায়েল জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণাও দিয়েছে।
জাতিসংঘের বার্ষিক সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতা বিষয়ক প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠে আসছে যে, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে জাতিসংঘ জানায়, তাদের কাছে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার “বিশ্বাসযোগ্য তথ্য” রয়েছে। একইসঙ্গে তদন্তকারীদের অনেক কারাগার ও আটক কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠন বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের অপমান, নগ্ন তল্লাশি, যৌন হুমকি এবং ধর্ষণের ভয় দেখানো একটি “ব্যবস্থাগত নির্যাতন নীতির” অংশে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে এসব অভিযোগ আরও বাড়তে থাকে।
গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তি পাওয়া নারী বন্দিরা জানিয়েছেন, আটক অবস্থায় তাদের শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নিপীড়ন, বিবস্ত্র করে তল্লাশি এবং মানসিক অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সেনাদের সামনে নারীদের কাপড় খুলতে বাধ্য করার অভিযোগও ওঠে। পশ্চিম তীরের কয়েকটি অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার কারণে বহু ফিলিস্তিনি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলে ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়ামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক হওয়া গাজাগামী ত্রাণকর্মীদের মধ্যেও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। বিদেশি মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করেন, ইসরায়েলি হেফাজতে তাদের কয়েকজন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেছেন, ইসরায়েলকে হামাসের সঙ্গে একই তালিকায় রাখা “অযৌক্তিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। ইসরায়েলের দাবি, তারা তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেননি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে “দুর্নীতিগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট” বলে অভিহিত করেছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, গাজা যুদ্ধের সময়কার অসংখ্য সাক্ষ্য, ভিডিও, চিকিৎসা প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংস্থার অনুসন্ধান যৌন সহিংসতার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই পদক্ষেপ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী বার্তা নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে নারী ও বন্দিদের সুরক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার দাবিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।